• ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    আন্দোলন

    “The life of a student is a life of preparation for the struggle of life…” জোরে জোরে পড়া শুরু করলাম যাতে সবাই শোনে। রিকশায় আমরা, তাতে কী! একটু পরে পরীক্ষা। অনুবাদ অংশটা তো পড়ি নাই কেউ। প্রথম লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুম ধুম করে মাথায় স্কেলের বাড়ি পড়ল। কাঠের স্কেল দিয়ে কেউ মাথায় মারে! মাথা ফেটে গেলে কী হইত? রিকশায় আমার সিটের ওপরে বসা জিনাপ। ওই-ই ওর স্কেলটা দিয়ে সমানে আমাকে মেরে যাচ্ছে। ওর সবচেয়ে অপ্রিয় সাবজেক্ট এই বাংলা দ্বিতীয় পত্র। ও বলে, বাংলা ব্যকরণ পড়ার চেয়ে নাকি এইডস হওয়া ভাল! এই রিকশায় আমরা যেই চারজন বসা—আমি, রিকি, কলি, জিনাপ—এই চারজনই বাংলা দ্বিতীয় পত্র সাবজেক্ট ঘৃণা করি, তবে বাংলা পড়ার চেয়ে এইডস হওয়া…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    নীল নীল সন্ধ্যা

    স্নান করে টাওয়াল দুইটা বারান্দায় দেওয়ার সময়ই মনে আসল, যেইদিন আমি টাওয়াল বারান্দায় রেখে বাইরে যাই সেদিনই ঝুম বৃষ্টি হয়। এক ভিজা টাওয়াল শুকাতে লাগে তিন দিন। তবে আজকে রিস্ক ফ্রি। বাসা থেকে বাইর হব না। তাই দুইটাই বাইরে রেখে আসলাম রোদে। ভাত খাওয়ার পরে শরীর ঝাঁপায়ে আসল মরার ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুমের মধ্যে মনে হইল, আমার টাওয়েল দুইটাই আজকে শ্যাষ! বারান্দার দরজা খোলা — আসবে পানি, ওঠা উচিত-ওঠা উচিত ভাবতে ভাবতে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লাসিক প্রতারণার শিকার হইলাম। আমার ব্রেইন আমাকে নিয়া গেল ছোটবেলায় দাদুর বাড়িতে।   গ্রীষ্মের লম্বা ছুটিতে দাদুর বাড়ির দোতলায় পাটি বিছানো খাটের উপর বেঘোর ঘুমাচ্ছি। আমার সিল্কের (কে জানে কীসের)…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    বিমান বাংলাদেশে একদিন…

    এয়ারপোর্ট থেকেই শুরু করি। আমি কোলকাতা থেকে ঢাকা ফিরব। এবং সেইদিন আমাকে ঢাকায় ফিরতেই হবে। এর আগের তিনদিন ধরে আমি ইন্ডিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ফ্লাই করে বেড়াচ্ছি। আমার পরনে একটা সাদা টি-শার্ট আর একটা নীল জিন্স, আর গলায় ঝুলানো একটা ছোট্ট ব্যাগ যেখানে পাসপোর্ট, টিকেট আর মোবাইল রাখা। ব্যাগেজ বলতে একটা এম সাইজ লাগেজ আর একটা একদম খালি শোল্ডার ব্যাগ যেটা আমি এয়ারপোর্ট থেকে শপিং করা জিনিস রাখার জন্যই খালি করে আনছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে নানা রকম জিনিস কিনে কিনে ওই শোল্ডার ব্যাগ আমার কাঁধের চেয়েও ভারি হয়ে গেল, কিন্তু প্লেনের কোনো খোঁজ তখনও পাওয়া গেল না। বিমান বাংলাদেশের পৌনে এগারোটার প্লেনে উঠলাম দুই ঘণ্টা পরে পৌনে একটায়। এই…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    ভুলোমন

    আমার বাবা ছিল খুবই ভোলাভালা মানুষ। তার ভুলে যাওয়া স্বভাব নিয়ে আমাদের হাসাহাসির অন্ত ছিল না। বাসার কোনো সিরিয়াস কাজের ভার কখনোই আমার বাবাকে দেওয়া হত না। বাজার টাজার তো কখনোই না! আমার বাবা এতটাই ভুলোমনা ছিল যে আমরা কোন বোন কোন ক্লাসে পড়ি, জিজ্ঞাসা করলে সেটাও অনেক কষ্টে মনে করার চেষ্টা করত। প্রায় সময়ই মনে করতে পারত না। বছরের প্রথমে নতুন ক্লাসের বই কিনতে গিয়ে ক্লাস নিয়ে প্রায়ই গড়বড় করে ফেলত। বেশিরভাগ সময়ই যে ক্লাস পাস করলাম, সে ক্লাসের বইই বাবা আবার কিনে আনত। নতুন ক্লাসে যে উঠেছি, সেটা ভুলেই যেত। প্রতি বছর এটা নিয়ে নতুন নতুন হাস্যকর গল্প তৈরি হত, এসব ভুলোপনা নিয়ে আমরা বাবাকে টিটকারি করতাম। তবু…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    স্যার

    শিক্ষকদের কান ধরানোমূলক শাস্তির উপর আমার কোনো ক্ষোভ নাই। এমন না যে আমার টিচার আমাকে কখনো কান ধরান নাই। কান ধরাইলে কানে সুড়সুড়ি লাগে, আর তাই আমার তখন খুবই হাসি পায়। এবং এই শাস্তি আমি খুবই পছন্দ করতাম। আমার আনন্দ হইত, আর আরো বেশি আনন্দ হইত যখন একজন আরেকজনের কান ধরে দাঁড়াইয়া থাকতাম। তাই আমাকে সবচেয়ে বেশিদিন পড়াইছেন যে স্যার, মিঠু স্যার তিনি কিন্তু আমারে কখনো কান ধরাইতেন না। ধরাইতেন, নাক। এবং নাক ধরে দাঁড়ায়ে থাকা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাকর শাস্তি। আমি স্যারের কাছে পড়া শুরু করছি ক্লাস ফোরে। এবং কলেজ লাইফ পর্যন্ত পড়ছি। স্যার পড়াইতেন ডিগ্রির ইংলিশ। আমি ডিগ্রি ক্লাশের সাথে ইংরেজি পড়া শুরু করি। আমার বোন ও…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    দুর্গাপূজার ছুটিতে

    তখন দুর্গাপূজার ছুটিতে আমরা সবসময় দাদুর বাড়ি যাই। শুধু আমরা না, দাদুর চোদ্দগুষ্টির সবাই তখন ওই বাড়িতে যায়। আর বিশাল বিশাল বিছানা করা হয়। আমার দাদুর বাড়ি মোটামুটি জমিদার বাড়ি। সেইখানে সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা রুম। বিশাল বৈঠকখানা, খাবার ঘর, রান্না ঘর—তার মধ্যে আবার একটা গ্যাসের চুলার ঘর, একটা মাটির চুলার ঘর, নিচে শোবার রুম কম—দুইটা। বাকিগুলা উপরে। নিচে লাকড়ি রাখার ঘর আছে। পাশেই একটু দূরে গরুদের রুম, ছাগলদের রুম, আবার খড় রাখার রুম—রুমের শেষ নাই। আমরা গেলে থাকতাম উপরে। উপরে একটা ঘণ্টার রুম, একটা পূজার রুম আর চারটা শোবার রুম। এর মধ্যে একটাকে আমরা মানে বাচ্চাকাচ্চা-কিশোর-নওজোয়ান—এদের রুম বানায়ে ফেলছিলাম। ওই রুমে কিছু ছিল না। মেঝেতে লম্বা করে চাটাই বিছানো…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    শার্লক হোমস

    দূরসম্পর্কিত এক মামা-র বিয়ে। আমরা গ্রামে দাদুর বাড়ি চলে গেলাম বিয়ের তিন চারদিন আগে। দাদুর বাড়ি তখন গিজ গিজ করছে লোকে। সবাই যার যার বয়েসীদের সাথে ঘুরছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। আমার মা ঘুরছে বউদের সাথে, কাজ করছে, রান্নাবান্না করছে, হাসিঠাট্টা করছে। বাবা ঘুরতো তার বয়সী সারাক্ষণ-গুরুগম্ভীর-আলোচকদের সাথে। দিদিও তার বয়সী ছোকরীদের সাথে সারাক্ষণ হাহাহিহিতে ব্যস্ত। বিধবা বুড়ি সব একসাথে পান ছেঁচে খাচ্ছে। আমরা ডজন ডজন বাচ্চা একসাথে নাশতা করতাম। ভাত খেতাম। বিকালে খই মুড়ি খেতাম। আমরা পিচ্চিরা বেশ একটা স্বাধীন দল তখন। কিচিরমিচির করে করেই দিন শেষ। বিয়ের ধুমধাম আমাদের কাছে একটা বেশ পোশাক পরা ছাড়া আর কিচ্ছু না। আমার দাদুর বিশাল বাড়ি। এক কোণায় থাকলে আরেক কোণার খবর পাওয়া যায়…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    বনভোজন

    হুঁট করে এই কথাটা মনে পড়ে গেল। যদিও এখন আর নাই, তবে তখন শীতকাল মানেই বনভোজন ছিল। অবশ্য বনভোজন কথাটা কখনো কাউকে বলতে শুনি নাই। বলত — পিকনিক, লিখত — বনভোজন। প্রত্যেক ব্যানারেই এই লেখাটা থাকতো — ‘চল বন্দু গুরে আসি’ বা ‘চল বন্দু ঘুরে আশি’। সেই সাথে আরো দুই একটা ভুল বানান। কক্সবাজারকে হয়তে লেখা ‘ককসোবাজার’, চাঁদা বানানে চন্দ্রবিন্দুই নাই, বান্দরবনকে ‘বানরবন’ অথবা আরো হাস্যকর কোনো ভুল। এই তো আমাদের ছোটবেলার দেখা ব্যানার। পাড়ার গলিতে গলিতে ঝুলানো হত প্রতি শীতে। সবাই পিকনিকে যেত। হয় কাপ্তাই, নয় রাঙামাটি, নয় খাগড়াছড়ি, নয় কক্সবাজার। বন্ধুরা মিলে যেত, আন্টিরা মিলে যেত, আঙ্কেলরা মিলে যেত, নানারা মিলেও যেত। যেতে পারতাম না শুধু আমরা। আমরা…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    বর্ষার বিয়ে

    বৃষ্টি শুরু হবার পর থেকেই বর্ষা নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা শুনছি। বাঙালি বোধহয় সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে এ মাসে। আর শৈশব — এইটার একটা বিশেষ অংশ মনে হয় এই মাস। কারো মাছ ধরার স্মৃতি, কারো জ্বর কিংবা বন্যা কিংবা এরকম কোনো দুর্যোগের কথা। যাই হোক, বর্ষা এসে পড়লেই আমার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা করে বিয়েতে যেতে। উহু! যেমন তেমন বিয়ে না — হিন্দু বিয়ে, গহীন গ্রামের মধ্যে, কনে বাড়ি যাওয়ার পথে হাঁটু সমান কাদা পার হতে হবে আর বহুদূর থেকে কনে বাড়ির ঢাকঢোলের শব্দ শোনা যাবে। এ রকম একটা ঘটনা আমার জীবনে আছে। কিন্তু এতই ছোটকালের সেই কথা যে বুঝিয়ে লিখতে গেলে কল্পনা মেশানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন…

  • ব্লগ,  স্মৃতিকথা

    কেন জাফর ইকবাল স্যাররে দেখলে পালায়ে যাইতে হয়

    আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। গণিত অলিম্পিয়াড হচ্ছে আমাদের স্কুলে। আমি দেয়ালে পা ঝুলায়ে উদাস মনে আমার বখাটে বান্ধবীদের সাথে বসে আছি। এক মেয়ে এসে আমাকে বলল সে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর অটোগ্রাফ নিতে চায়। লজ্জায় বলতে পারতেছে না। আমি যেন একটু ম্যানেজ করে দেই। আমি তখন ক্ষুদে বুদ্ধিজীবী। সুতরাং যারপরনাই বিরক্ত। আমি বললাম, ‍‌‌‌‍”এইসব ছোট লেখকদের বই পড়ো কেন? বড় লেখকদের বই পড়বা। টলস্টয় পড়বা, প্লেটো পড়বা। আর জাফর ইকবালরে আমি বলব অটোগ্রাফ দিতে! হুহ্! একদিন উনি আসবে আমার অটোগ্রাফ নিতে, মিয়া, যাও যাও।” একটু পর ইয়া বিশাল এক গোঁফওয়ালা লোক আমার দিকে একটা কাগজ আর কলম এগিয়ে দিলেন। বললেন, “একদিন না আজকেই তোমার অটোগ্রাফ নিতে চাই। তুমি খুব…