নীল নীল সন্ধ্যা

স্নান করে টাওয়াল দুইটা বারান্দায় দেওয়ার সময়ই মনে আসল, যেইদিন আমি টাওয়াল বারান্দায় রেখে বাইরে যাই সেদিনই ঝুম বৃষ্টি হয়। এক ভিজা টাওয়েল শুকাতে লাগে তিন দিন। তবে আজকে রিস্ক ফ্রি। বাসা থেকে বাইর হব না। তাই দুইটাই বাইরে রেখে আসলাম রোদে।

ভাত খাওয়ার পরে শরীর ঝাঁপায়ে আসল মরার ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুমের মধ্যে মনে হইল, আমার টাওয়েল দুইটাই আজকে শ্যাষ, বারান্দার দরজা খোলা—আসবে পানি, ওঠা উচিত-ওঠা উচিত ভাবতে ভাবতে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লাসিক প্রতারণার শিকার হইলাম

আমার ব্রেইন আমাকে নিয়া গেল ছোটবেলায় দাদুর বাড়িতে।

গ্রীষ্মের লম্বা ছুটিতে দাদুর বাড়ির দোতলায় পাটি বিছানো খাটের উপর বেঘোর ঘুমাচ্ছি। আমার সিল্কের (কে জানে কীসের) পিছলা হাফপ্যান্ট আর পিছলা পাটি মিলে ঘুমের মধ্যেই স্ট্রাগল চলতেছে পিছলায়ে পড়ে না যাওয়ার। জানালার পাশে কামরাঙা গাছের ছটফটানি আর নিচে গরুর ঘর থেকে আমাদের লাল গরু রুম্পা, ঝুম্পার গ্যা গ্যা চিৎকার।

আমি সব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।

কামরাঙা গাছের ঠিক পাশে সবুজ পুকুরে দিদিমণি বাসন মাজে। নারকেলের ছোবড়া আর চুলার ছাই আর তিব্বত ৫৭০ সাবান দিয়ে পিতলের থালা বাটি কস কস শব্দ করে মাজতে মাজতে কখনো হাতের শাঁখার সঙ্গে পিতলের ঘষা লেগে টুং করে বেজে ওঠে সোজা পৌঁছে যায় দোতলায়—একদম আমার কানের ভিতরে।

আমি পাশ ফিরে ঘুমাইতে গিয়ে আবার পিছলাতে পিছলাতে ঘুমের মধ্যেই খাটের কোণা শক্ত করে চেপে ধরি। আর স্বপ্নে দেখি নৌকার উপরে ঘুমাচ্ছি। নৌকা যাচ্ছে শরৎকালের আকাশের তলে কাশবন ঘেঁষে, আমি নৌকার কাঠগুলি শক্ত করে ধরে রাখি যেন দুলতে দুলতে পড়ে না যাই।

ছবি. পারমিতা হিম

ঘুম ভাঙতে চায় না। দিদিমনি সন্ধ্যাপূজায় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজায়। উলুলুলু শব্দ শুরু করলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।

দোতলার কোনো ঘরে কেউ নাই। ইলেকট্রিসিটি নাই। বাইরে সন্ধ্যার নীল নীল অন্ধকার। আমি অনেকক্ষণ এমনিই শুয়ে থাকি। কড়িকাঠ গুণি। ধীরে ধীরে নিচে নামি। কাঠের ঘর মচ মচ শব্দ করে তখন।

টানা বৈঠকঘরে সবাই চা-মুড়ি নিয়ে খোশগল্পে ব্যস্ত। আমার ও রকম খাড়া খাড়া লাল চুল আর ঘুমে ডোবা চেহারা দেখে সবাই খিল খিল করে হেসে উঠল। বলল, তুই ঘুমের মধ্যে এত নাড়াচাড়া করিস কেন? মারামারি করিস নাকি ঘুমের মধ্যে? চাইট্যাচাটোনি কোথাকার!

আমি কি পাত্তা দেই এইসব গ্রামের লোকদেরকে? দাঁত ব্রাশ করে না ওরা, আঙুল দিয়ে মাজে। কথাই বলব না আমি এদের সাথে!

চুপচাপ গিয়ে বসি রান্নাঘরে দিদিমণির পাশে। দিদিমণি খই ভাজবে। খইয়ের সাথে মিঠা গলায়ে মিশাবে, তারপর গরম গরম খইয়ের দলা খেতে দিবে আমাকে।

একটা বড় বাটি নিয়ে আমি চুলার পাশে বসে থাকলাম। দিদিমণি তখনও ব্যস্ত গরুর খাবার নিয়ে। ইয়া বড় বড় হাড়িতে ভুষি, মণ্ড হাবিজাবি মিশায়ে ঘুটা ঘুটা আর ঘুটা। সে তাকাচ্ছেই না হাভাইত্যার মত বাটি নিয়ে বসে থাকা আমার দিকে। মাটির চুলার গনগনে আগুনের আঁচ আর আমার মনের রাগ দুটোই আমার চোখেমুখে আঁকা থাকে নিশ্চয়ই।

বৈঠকখানা থেকে আবারো হাসির লহর ভেসে আসে। কে যেন বলে, কীরে তুই কি ঘুম থেকে উঠে গরুর খাবার বানাতে গেছিস?

রাগে আমার গা জ্বলে যায়। মন চায় এক্ষুনি গিয়ে মারতে মারতে ভর্তা করে ফেলি ওই কটুক্তিকারী শয়তানকে। বাইরের নীল অন্ধকার দেখে আলসেমি করে আর যাই না। কাছেই কোথাও ঘঁ ঘঁ শব্দ করে ব্যাঙ ডেকে ওঠে। আমি চুলার পাশেই গালে হাত দিয়ে বসে থাকি।

ঠাট্টা হাসি মশকরার গ্রাম্য লঘু জীবনের অসারত্ব নিয়ে সিরিয়াস ভাবনা ভাবতে থাকি।

শহুরে ঘুম যখন ভাঙল তখন ব্যাঙের মত ডাকতেছে আমার মোবাইল। রুমের অর্ধেক অংশ পানিতে ভেজা। বারান্দায় টাওয়াল দুইখান ভিজে চুপচুপ আর বাইরে এমন ঘনঘোর নীল সন্ধ্যা।

কভার. পারমিতা হিম, ছবি. খাদিজাতুল কোবরা, নভেম্বর ২০১৪

কেন জাফর ইকবাল স্যাররে দেখলে পালায়ে যাইতে হয়

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। গণিত অলিম্পিয়াড হচ্ছে আমাদের স্কুলে। আমি দেয়ালে পা ঝুলায়ে উদাস মনে আমার বখাটে বান্ধবীদের সাথে বসে আছি। এক মেয়ে এসে আমাকে বলল সে জাফর ইকবাল এর অটোগ্রাফ নিতে চায়। লজ্জায় বলতে পারতেছে না। আমি যেন একটু ম্যানেজ করে দেই।

আমি তখন ক্ষুদে বুদ্ধিজীবী। সুতরাং যারপরনাই বিরক্ত।

আমি বললাম, ‍‌‌‌‍”এইসব ছোট লেখকদের বই পড়ো কেন? বড় লেখকদের বই পড়বা। টলস্টয় পড়বা, প্লেটো পড়বা। আর জাফর ইকবালরে আমি বলব অটোগ্রাফ দিতে! হুহ্! একদিন উনি আসবে আমার অটোগ্রাফ নিতে, মিয়া, যাও যাও।”

একটু পর ইয়া বিশাল এক গোঁফওয়ালা লোক আমার দিকে একটা কাগজ আর কলম এগিয়ে দিলেন। বললেন, “একদিন না আজকেই তোমার অটোগ্রাফ নিতে চাই। তুমি খুব মজার বাচ্চা বলে মনে হচ্ছে।”

আমি বুঝলাম এই লোকই জাফর ইকবাল। দেয়ালে থাকা অন্যরা ভোঁ-দৌড় দিল উনাকে দেখে। একমাত্র আমি ভুরু কুঁচকে বসে থাকলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমিও দৌড় দেই। ভাবের কারণে তা করা গেল না। গম্ভীরভাবে উনার কাগজে লিখে দিলাম—‘পা..র..মি..তা’।

এরপরে উনার সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হইত আমার এক বান্ধবীর কারণে। তখন একমাত্র আমারই ই-মেইল অ্যাড্রেস আছে। সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। আমার বান্ধবী উনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। আর তাদের ই-মেইল বাহক ছিলাম আমি। কিন্তু যেহেতু আমি উনার ভক্ত না, সেহেতু আমি নিজে কোনো খাতির করতাম না উনার সাথে।

By Nazmush Shams - Own work, CC BY-SA 3.0, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=25340575
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এক বছর পর আবার অলিম্পিয়াড হল। উনি আমাদেরকে আসতে বললেন। আমি গেলাম ঠিকই। কিন্তু উনার আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম। ইগোর চোটে বলতে পারতেছিলাম না যে স্যার আমি আসছি। উনি তখন অটোগ্রাফ দিতে মহাব্যস্ত।

চশমা নাকের ডগায় রেখে অটোগ্রাফ দেয়ার ফাঁকে আমাকে দেখে ফেললেন। দেখে ডাক দিলেন। উনার সামনের অটোগ্রাফপ্রার্থী কিচির মিচির কিচির মিচির পোলাপানরে দেখায়ে বললেন, এদেরকে সুন্দরভাবে লাইন করে দাঁড় করাও তো দেখি। পরীক্ষা হয়ে যাক তুমি লিডার হিসেবে কেমন?

কথাটা শুনে তো আমার বিষম বিরক্তি হইল।

আমি চিৎকার দিয়ে বললাম, যেসব পোলাপান লাইনে দাঁড়াবে না, তাদের অটোগ্রাফ দেওয়া বন্ধ। তাদেরকে বহিস্কার করা হবে।

এমন কঠিন কথা কোমলমতি শিশুদের স্যার কোনোদিন বলতে পারতেন না। উনি আমার এ কঠোর ভাব দেখে খুবই হতাশ হলেন। আরো হতাশ হলেন যখন দেখলেন ঘোষণার চোটে বাচ্চাগুলা ভদ্রভাবে লাইনে দাঁড়ায়ে গেছে। অথচ দুই ঘণ্টা ধরে এগুলারে লাইনে আনার জন্য ভলান্টিয়াররা রীতিমত হিমশিম খাচ্ছিল। আমার মনে কৌতূহল হইল অটোগ্রাফ কেমনে দেয় দেখি।

দেখলাম লেখা—

‘অনেক অনেক শুভেচ্ছাসহ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল’

সবাইরে একই কথা লিখতেছে। আর নামটাও স্রেফ বানান করে লিখা। কোনো ঘুরানো প্যাঁচানো স্টাইল নাই। ওরকম আমিও লিখতে পারি চাইলে। আমার কাছে নিজের স্বাক্ষর মানে শুধু প্রথম অক্ষর টানা হাতে বড় করে লেখা। ওইটা ছাড়া বাকিগুলা হবে প্যাঁচানো ও দুর্বোধ্য। যে লোক এমন নব্যসাক্ষরদের মত নাম লেখে, তাকে মেধাহীন না ভাবার কোনো কারণই আমি পাইলাম না।

আমি উনাকে বললাম, শুনেন, আপনার কারণে অনুষ্ঠানে অনেক ডিস্টার্ব হয়। এই একই কথা সবাইরে লিখতেছেন! আসার সময় এইটা এক হাজারটা ফটোকপি করে আনলেই পারতেন!‍ হুদাই এত সময় নষ্ট হত না। আপনারও হাত ব্যথা হইত না।

উনি আমার কথা শুনে হাসতে থাকলেন।

আমি বললাম, শোনেন, নেক্সট টাইম কিন্তু এইটা করবেন। মানুষরে এইসব ডিস্টার্ব দিবেন না। না হইলে আমি নিজে ফটোকপি করে নিয়ে আসব। আমি আনলে কিন্তু পার পিস পাঁচ টাকা করে বেচব। তখন কিছু বলতে পারবেন না।

পরের বার উনি আমাকে মেইল করলেন, লিখলেন আমরা যেন নীল পোশাক পরে অলিম্পিয়াডে আসি। আমি মহা বিরক্ত। আমি নীল শার্ট আর মৌরিন নীল জামা গায়ে দিয়ে গেলাম। কিন্তু উনার কোনো পাত্তাই পাওয়া গেল না। উনি যথারীতি ব্যস্ত। বিকাল চারটার দিকে হবে বোধহয় উনি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন রাস্তায়। তখন কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তার বউ আসমা কিবরিয়া ‘শান্তির সপক্ষে নীলিমা’ (নামটা কি এইটা? ঠিক মনে নাই) আন্দোলন করতেছেন। আন্দোলনটাতে মনে হয় বিকাল বেলা একটা টাইমে সবাই নীল পোশাক পরে রাস্তায় দাঁড়ায়ে থাকো-টাইপ কোনো ব্যাপার ছিল।

আমি তখন উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ পড়ে ফেলছি। পড়ে ফেলছি দূরবীন, প্রথম আলো, সেই সময়। সুতরাং আমি মনেপ্রাণে নকশাল, মার্ক্সিস্ট তো বটেই। এইসব শান্তিবাদী, গান্ধীবাদী আন্দোলন নিয়ে আমি গভীর সন্দেহ পোষণ করলাম এবং উনাকে তিরষ্কার করলাম একজন মার্ক্সিস্টকে অমন একটা ফালতু আন্দোলনে নেয়ার জন্য।

বেচারা! উনি আমার পড়াশোনার খোঁজ নিচ্ছিলেন। আমি আরো বিরক্ত হইলাম। আমি বললাম, আজকে আলপিনে (তখন রসালো-র নাম ছিল আলপিন) আপনার যে ছড়া ছাপানো হইছে সেইটা কি আপনার না আপনার ছেলের লেখা আসলে? এরকম একটা ফালতু ছড়া আপনে লিখলেন? আপনার লজ্জা হইল না এমন ছড়া লিখেন! লিখেন তো লিখেন আবার ছাপেন!

জাফর ইকবাল ভক্তরা আমাকে দোররা মারার আগে সেই ছড়াটা পড়ে দেখেন।

“দেশের ডাকে সাড়া দিলাম সবাই বলে বেশ,
প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলাম সবাই হেসে শেষ”

উনি মিনমিন করে বললেন, খুব খারাপ হইছে নাকি?

আমি বললাম, সত্যি করে বলেন তো এইটা কে লিখছে? আপনার ছেলে লিখছে, তাই না? আপনি নিজের নামে ছাপায়ে দিছেন, তাই না? এইরকম ক্লিশে জিনিস তো আপনি লিখেন নাই! এর চেয়ে কত ভাল কবিতা তো আমিই লিখি। সত্যি কথা বলেন দেখি!

উনি বললেন, না, না, আমিই লিখছি এই খারাপ ছড়া। তুমি নিশ্চয়ই অনেক ভাল লিখ। কী করব বল! আমি তো তোমার মত লিখতে পারি না। আচ্ছা তুমি এত অদ্ভুত বাচ্চা হইলা কেমনে? শার্ট প্যান্ট পরো কেন ছেলেদের মত? চুল বয়কাট?

আমি বললাম, আমি অদ্ভুত না, অস্বাভাবিক না, আমি অগতানুগতিক। আপনি বড় লেখক হইবেন কেমনে? আপনি তো শব্দই জানেন না!

উনি হেসে ফেললেন। বললেন, একদিন তুমি যখন বড় হবা, প্রেম করবা, বিয়ে করবা, তোমার বাচ্চাদের আর তোমার বরকে আমি বলব তুমি ছোটবেলায় কেমন পাকা ছিলা!

আমি বললাম, আমি জীবনেও বিয়ে করব না। আর প্রেম আবার কী? জানেন না, ফ্রয়েড কী বলছে? সবই শারীরিক আকর্ষণ! প্রেম-ট্রেম বলে কিছু নাই!

স্যার হো হো হো করে হাসছিল।

পারমিতা হিম এর মার্চে প্রকাশিত উপন্যাস নারগিস কিনতে
ছবিতে ক্লিক করুন
দাম ২০৪ পৃষ্ঠা, ৫০০ টাকা
-বহিঃপ্রকাশ

ষোলোই ডিসেম্বরে আমার অফিসের কাজ ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আমি একটু সাজগোজ করে, মাঞ্জা মেরে গেছি ওখানে। সেখানে জাফর ইকবাল স্যার ছিল। আমি পালায়ে পালায়ে থাকলাম যেন উনার সাথে আমার দেখা না হয়। কিন্তু অন্যেরা সবাই যখন উনার অনুভূতি জানতে চাইল তখন আমারও মাইক্রোফোন আগায়ে দিতে যেতে হইল। আমার সামনে বিটিভি আর দেশ টিভির রিপোর্টার। দুজনের পিছনে, মাঝখানে আমি। যতটা সম্ভব চেহারা লুকায়ে উনার দিকে মাইক্রোফোন ধরে আছি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ উনি থেমে গেলেন। তারপর আমার সামনের দুজনকে দুহাতে সরায়ে আগায়ে এসে আমারে জড়ায়ে ধরলেন।

বললেন, “আরেরররর তুমি! তুমি রিপোর্টার হইছ!”

আমি ততক্ষণে লজ্জায় শেষ।

আমি উনার কানে কানে বললাম, “স্যার, আমার তো ভার্সিটি জীবন প্রায় শেষ, আমি তো আর স্কুলে পড়ি না এখন।”

উনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। পাশে থাকা ইয়াসমিন ম্যাডামকে বললেন, “ওরে চিনছো? ওই যে চট্টগ্রামের মেয়েটা। পাকনা পাকনা কথা বলত!”

ম্যাডামও ততক্ষণে চিনে ফেলছে আমারে। এবারে উনিও আমারে জড়ায়ে ধরলেন।

বললেন, সিলেট আসবা বলে তো আর আসো নাই।

পারমিতা হিমের আরো লেখা: স্মৃতিকথা, সাম্প্রতিক

স্যার এরপর অনেক কথা বলল। ছোটবেলায় উনার সাথে কী কী পাকনামি করতাম, মৌরিনকে কীভাবে হেল্প করতাম, অলিম্পিয়াডে কী দুষ্টামি করতাম, স্কুলে আমি কেমন বখাটে ছিলাম, উনাকে গোঁফ উঠায়ে চা খেতে বলছিলাম, ফালতু কবিতা কেন লিখে তা নিয়ে ক্যাঁচর-ম্যাঁচর করছিলাম—সব।

এদিকে আমার সহকর্মীরা ধৈর্য সহকারে, মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ায়ে আছে। আমার মোটামুটি লজ্জায় মরি মরি অবস্থা।

শেষে উনি বললেন, কিন্তু তুমি এরকম মেয়ে মেয়ে হয়ে গেলা কেমন করে? ওমা টিপও পরো এখন! এখন তো দেখি আবার লজ্জাও পাও! প্রেম করো নাকি?

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৩

বিমান বাংলাদেশে একদিন…

এয়ারপোর্ট থেকেই শুরু করি। আমি কোলকাতা থেকে ঢাকা ফিরব। এবং সেইদিন আমাকে ঢাকায় ফিরতেই হবে।

এর আগের তিনদিন ধরে আমি ইন্ডিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ফ্লাই করে বেড়াচ্ছি। আমার পরনে একটা সাদা টি-শার্ট আর একটা নীল জিন্স, আর গলায় ঝুলানো একটা ছোট্ট ব্যাগ যেখানে পাসপোর্ট, টিকেট আর মোবাইল রাখা। ব্যাগেজ বলতে একটা এম সাইজ লাগেজ আর একটা একদম খালি শোল্ডার ব্যাগ যেটা আমি এয়ারপোর্ট থেকে শপিং করা জিনিস রাখার জন্যই খালি করে আনছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে নানা রকম জিনিস কিনে কিনে ওই শোল্ডার ব্যাগ আমার কাঁধের চেয়েও ভারি হয়ে গেল, কিন্তু প্লেনের কোনো খোঁজ তখনও পাওয়া গেল না।

বিমান বাংলাদেশের পৌনে এগারোটার প্লেনে উঠলাম দুই ঘণ্টা পরে পৌনে একটায়। এই দুই ঘণ্টায় এয়ারপোর্টের স্ক্রিনে যতগুলি প্লেনের ফ্লাইট ছিল তার মধ্যে শুধু দুইটা প্লেনের ফ্লাইট ডিলে। দুইটাই বাংলাদেশে যাবে, দুইটাই বাংলাদেশের প্লেন। একটা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, আরেকটা বাংলাদেশ বিমান।

যাই হোক, আমার সিট সামনের দিকেই, জানালার পাশে। গত তিনদিনের বিশ্বব্যাপী ফ্লাইটে ‘দুইজনের সিট’ এর দেখা পাই নাই। সেই বিমানগুলিতে ছিল তিন সিট একসাথে। সে ফ্লাইটগুলি ছিল সুন্দর সুন্দর সব ছেলে যাত্রীতে পরিপূর্ণ এবং তখন আমার মা আমার সাথে ছিল। ওইসব যাত্রায় সবসময়ই কোনো না কোনো সুন্দর ছেলের সিট ছিল আমাদের দুজনের সিটের সাথে। আর এখানে বলে রাখা ভালো, আমার মা সবসময়ই মাঝখানের সিটে বসে, জানালার পাশের সিট তার পছন্দের না।

আর যখন আমি রিটার্ন ফ্লাইটে ফেরা শুরু করলাম, তখন প্রথম ফ্লাইটে আমার পাশে বসলেন একজন সত্তরের কাছাকাছি বুড়ো, যার বাড়ি কেরালা বলে ধারণা করি (তার কথা বলার টোন থেকে), পরের ফ্লাইটে একজন সর্বদা পান-জর্দা চিবানো সত্তরোর্ধ্ব বুড়ি, যিনি ফ্লাইটে পুরা পানের বাটা নিয়ে হাজির ছিলেন এবং তারও পরের ফ্লাইটে পাশে ছিল একজন ‘বাংলাদেশি মেয়ে ঘৃণাকারি’ কোলকাতার বাঙালি মহিলা, যিনি একাই ফ্লাই করতেছিলেন তবু উনার গয়নাগাটির পরিমাণ দেখে আমি ধারণা করছিলাম যে উনি হানিমুনে যাচ্ছেন। আলাপে আলাপে উনি বলেই ফেললেন—উনি বাংলাদেশের মেয়েদের ঘৃণা করেন, কারণ তার ভাইকে বাংলাদেশের এক মেয়ে ‘পটিয়ে’ বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে গেছে। সে মেয়ে কিছুতেই জামাইয়ের বাড়ি কোলকাতায় থাকবে না। তাই তার বড় ভাই, পরিবার পরিজন ছেড়ে এখন থাকে ঢাকা। আর তাই বাংলাদেশের মেয়েদের তিনি এক কথায় ‘ঘৃণা করেন’।

যাই হোক, বাংলাদেশ বিমানে বেশিরভাগ যাত্রীই বয়স্ক, তার ওপর রোগী। মহিলারা আছেন বাচ্চাকাচ্চা সমেত। আমার বয়সী কোনো মেয়ে যাত্রী দেখা গেল না। আর আমার পাশের সিটের যাত্রীকে তখনো দেখা গেল না। বিমানের শেষ বাসে তিনজন যাত্রী আসলেন। তিনজনই লম্বা জোব্বা পরা, মুখে লম্বা দাঁড়ি, বয়সে বেশ প্রবীণ। তার মধ্যে একজন আবার হাতে ছয়টা নানান সাইজের পোটলা (পোটলা বললাম কারণ ওগুলাকে ব্যাগ বললে ভুল হবে আর প্যাকেটও ঠিক মানানসই শব্দ না ওগুলার জন্য) নিয়ে আমার সিটের দিকে আগায়ে আসতেছেন। আমি তার হাতের ছয় ছয়খান প্যাকেট দেখে, জীবনে যত বাস-ট্রেন-প্লেন ভ্রমণ করছি সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে বুঝে নিলাম—উনিই আমার সহযাত্রী।

উনি আমার পাশে এসে বসলেন। উনার পায়ের মাঝখানের জায়গায় কষ্টেসষ্টে দুইটা পোটলা রাখলেন। আমার সাথে এক ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ থাকায় তার বাকি চারব্যাগের একখান আমার সিটের নিচে রাখার অনুরোধ করলেন। আমি ভাবলাম, বড়জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিটেরই তো ফ্লাইট, থাক, রাখুক। এরপর পিছনের দুই সিটের যাত্রীকে অনুরোধ করে তার বাকি গাট্টিবোঁচকার একটা ব্যবস্থা করা হল।

দোয়া মোনাজাত পাঠ শুরু হল। এয়ারহোস্টেজ তার অদ্ভুত রঙের লিপস্টিক সমেত আমাদের স্বাগত জানালেন। দুইজন কেবিন ক্রু এই ফ্লাইটে। একজন মহিলা, একজন পুরুষ। তাদের চেহারা মনে পড়লেই আমি জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ি। এতই হতাশ হয়ে পড়ি যে এইটুকু লাইন লেখার পরে আবার এই লেখা শুরু করতে আমার তিনদিন সময় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তাদের সম্পর্কে, তাদের ইংরেজি উচ্চারণ ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে; এমনকি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে আর একটাও লাইন না লিখব না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।  Continue reading “বিমান বাংলাদেশে একদিন…”

ভুলোমন

আমার বাবা ছিল খুবই ভোলাভালা মানুষ। তার ভুলে যাওয়া স্বভাব নিয়ে আমাদের হাসাহাসির অন্ত ছিল না।

বাসার কোনো সিরিয়াস কাজের ভার কখনোই আমার বাবাকে দেওয়া হত না। বাজার টাজার তো কখনোই না!

আমার বাবা এতটাই ভুলোমনা ছিল যে আমরা কোন বোন কোন ক্লাসে পড়ি, জিজ্ঞাসা করলে সেটাও অনেক কষ্টে মনে করার চেষ্টা করত। প্রায় সময়ই মনে করতে পারত না।

বছরের প্রথমে নতুন ক্লাসের বই কিনতে গিয়ে ক্লাস নিয়ে প্রায়ই গড়বড় করে ফেলত। বেশিরভাগ সময়ই যে ক্লাস পাস করলাম, সে ক্লাসের বইই বাবা আবার কিনে আনত। নতুন ক্লাসে যে উঠেছি, সেটা ভুলেই যেত।

প্রতি বছর এটা নিয়ে নতুন নতুন হাস্যকর গল্প তৈরি হত, এসব ভুলোপনা নিয়ে আমরা বাবাকে টিটকারি করতাম। তবু বাবা ভুলে যেত।

একবার, এক বছর বাবা আমাদের চার বোনের বইই ঠিকমত নিয়ে আসল। সবাই অবাক হল আর আমার হল সন্দেহ। আমি খুব ভালমত চেক করে দেখলাম, আমাদের সব বোনের বইয়ের সেটেই ধর্ম বইটা হল ‘ইসলাম ধর্ম শিক্ষা’ আর গার্হস্থ্য বইয়ের জায়গায় কৃষি শিক্ষা বই!

logo paromita

শুরু হল আমাদের হাসাহাসি। একটা কাজও আমার বাবাকে দিয়ে হয় না—এ নিয়ে মায়ের তিরস্কার। বাবার খুবই মেজাজ খারাপ হল।

বলল, “তোমাদেরকে দেখে তো মনে হয় না তোমরা গার্হস্থ্য পড়বা, আমাকে দোকানদার জিজ্ঞাসা করল, কৃষি না গার্হস্থ্য? আমি কৃষি দিতে বললাম। আর ধর্ম তো জিজ্ঞাসাই করে নাই!”

আমি বললাম, তোমার কি আমাদের দেখে মনে হয় আমরা সবজি চাষ পড়ব?

বাবার অপদস্থ মুখ দেখেও আমাদের হাসাহাসি থামল না।

এখন খুব লঘুভাবে বললেও, তখন আমি তার এসব কাজকারবারে খুবই বিরক্ত হতাম।

untitled-17-copy-jpg12
আমার বাবা (বাবুল পাল, ১৯৫৩-২০১২)

একবার আমার নতুন স্কুলের ড্রেস এনেছিল জুন মাসে। জানুয়ারি থেকে মার্চ—তিনটা মাস আমি স্কুলে যাওয়া নিয়ে খুব অস্বস্তিকর অবস্থায় ছিলাম। পরে বাবার দোকানের জামার চিন্তা বাদ দিয়ে পাড়ার দোকান থেকেই নতুন ড্রেস বানিয়ে ফেলি। আমার বাবার নিজেরই কাপড়ের দোকান আর টেইলার্স ছিল। এবং আমার চৌদ্দগুষ্টির বিয়ের ড্রেস, উৎসবের ড্রেস, স্কুলের ড্রেস সবই ওখানে বানানো হত।

আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি, আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আমি সায়েন্সে পড়ি নাকি কমার্সে!

আমার বাবা আমতা আমতা করে বলে এসেছিল, কী জানি, মনে হয় আর্টসে পড়ে!

বাসায় এসে আমাকে খুব ভনিতা করে বাবা জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা তুমি আর্টসে না কমার্সে!

আমি মুখ ঝামটা দিয়ে বললাম, আর্টসে কমার্সে হব কেন? অবশ্যই আমি সায়েন্সে।

তারপর আমি আমার বড়বোন মারফত যখন নেপথ্যের কাহিনী জানতে পারলাম, আমার মাথায় আগুন লেগে গেল!

এমনিতেই নানা কারণে আমি বাবার এসব আচরণ নিয়ে খুবই ক্ষিপ্ত ছিলাম। একটা মানুষ কী করে সবই ভুলে যায়! আরো কিছু কারণ ছিল ক্ষেপে থাকার। একটা একটা করে বলি।

আরো পড়ুন: স্যার / পারমিতা হিম

বাবার অভ্যাস ছিল রাতে বাসায় ঢুকে রাতের খাবারের সবগুলো মেন্যুর ইংরেজি নাম জিজ্ঞাসা করা। কিছু কমন জিনিসের নাম ছাড়া বাকিগুলো পারা একটু কঠিনই ছিল বটে। তখন তো গুগল ছিল না। সংসদ এর মোটা ডিকশনারি ঘেটে ঘেটে আমরা পাগল হয়ে যেতাম। সব শব্দ পাওয়া যেত না।

ধরেন ডাল—খাদ্যশস্য ডালের ইংরেজি লেন্টিল। কিন্তু রান্না করা ডাল আর ভুনা করা ডালকে ইংরেজিতে কী বলে—এটা তখন বলতে পারা খুব মুশকিল।

প্রতি রাতে এইরকম ইংরেজি অত্যাচারের কারণে আমরা মাকে বলতাম, আমরা জানি না, এমন কোনো তরকারি রান্না করা যাবে না! তারপরেও কিছু না কিছু উল্টাপাল্টা খাবারের ইংরেজি নামের গ্যাঁড়াকলে আমরা পড়েই যেতাম।

অন্ধকার জায়গায় হঠাৎ করে লাইট জ্বালালে তেলাপোকারা যেমন আলমারির পেছনে, আনাচে কানাচে ঘুপচি অন্ধকার সরে যায়, আমার বোনরাও তেমন আমার বাবাকে ঘরে ফিরতে দেখলেই—লাইট নিভিয়ে, সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে গভীর ঘুমের ভান করত। আমার এইসব নাটক করতে আত্মসম্মানে লাগত খুব। তাই আমি ঘুমাতামও না, ভানও করতাম না।

বাসা ছাড়াও, নানা জায়গায় আমাকে নানান ইংরেজি ট্রান্সলেশন জিজ্ঞাসা করে করে আমার জীবনটার ফালুদা বানানো ছিল আমার বাবার প্রধান কাজ।

মনে আছে, একবার দুর্গাপূজার সময়, আমি আমার দাদুর বাড়িতে ছিলাম। আমার দাদু তার কাজকারবারের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি প্র্যাকটিস করত। সবাই তাকে এই হোমিওপ্যাথি নিয়ে নানা রকমের কথা বলে খুব ক্ষেপাত। আমিও নানা কিছু বলে ক্ষেপাতাম। সেবারের সেরা ক্ষেপানো ছিল—“ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মরিয়া গেল”, এ কথা বলে স্লোগানের সুরে বলে ওঠা—‘কোন সে ডাক্তর’? অন্যরা স্লোগান ধরবে—‘নির্মল ডাক্তর!’

বাবার সামনে এরকম ফাজলামো কেউ করতাম না বটে, কিন্তু পূজাবাড়িতে গণ্ডগোলের মধ্যে তার কানে বাচ্চাদের স্লোগান যেতেই পারে! আমাদের মণ্ডপে সন্ধ্যাবেলা তখন আমি নাচানাচি নিয়ে খুব ব্যস্ত। সেখানে দুই হাতে দুই ধূপদানি নিয়ে নাচার একটা স্টাইল ছিল। বড়রা সেটা করলেও আমি ছোট বলে আমাকে কখনো ধূপদানি নিতেই দিত না। আমি খুব চেষ্টা করছিলাম মামাদেরকে পটিয়ে নাচানাচির মধ্যেই একটা ধূপদানি বাগানোর। এর মধ্যেই আমার বেরসিক বাপ এসে আমার শার্টের কলার ধরে এক সাইডে নিয়ে বলল, বল তো “ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মরিয়া গেল” এর ইংরেজি কী?

আমি এক ঝটকায় কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ধুর!

বলে আমি আমার কাজ, মানে ধুপদানি সংগ্রহের কাজে চলে গেলাম।

পরের দিন ‘বিশ্ব বেয়াদব’ হিসেবে আমার বিচার করা হল। দাদুর পিছে পিছে ডাক্তারি স্লোগানও বন্ধ হয়ে গেল। পুরো পূজার আনন্দ মাটি হল। এ রাগ আমি ভুলতেই পারি নাই।

আরো পড়ুন: দুর্গাপূজার ছুটিতে / পারমিতা হিম

রাগার কারণ আরো আছে। কোনো পরিবারে নতুন সন্তান হলে আমার বাবা নাকি নাম রাখত—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি। এছাড়া কোনো নাম আমার বাবার স্টকে নাই।

আমার বড় বোনের যখন জন্ম হল তখন যথারীতি আমার বাবা নাম রাখল—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি। সবার তীব্র প্রতিবাদে এসব নাম বাতিল হয়ে গেল। ওর নাম রাখা হল—নন্দিতা। আর ডাক নাম—রিমি।

এদিকে, আমার জন্মের সময় আমার বাবা ছিল দেশের বাইরে। তাই সে চিঠিতে যখন আমার সম্ভাব্য নাম পাঠালো—ওগুলাই—সীতা, গীতা, রিতা, মিলি, ঝিলি, মৌসুমি—সবাই তার অনুপস্থিতির মর্যাদা রক্ষার্থে আমার বড় বোনের নামের সাথে মিলিয়ে আমার ডাক নাম রেখে দিল—মিলি। আর ভাল নাম—পারমিতা।

যাই হোক, খুব বেশি চালু হয় নাই ‘মিলি’ নাম। আর আমারও এই নাম জীবনে পছন্দ হয় নাই। আমার সব বোনের সুন্দর সুন্দর নাম। ওরা আমাকে এটা নিয়ে খুব ক্ষেপাত তখন। আর আমার সব রাগ গিয়ে পড়ত আমার বাপের ওপর।

তাই, আমার বড়বোনের শ্বশুড়বাড়িতে গিয়ে আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ার অপরাধ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। আমি সোজা গিয়ে আমার বাবাকে বললাম, তোমার যখন এতই ভুলোমন, কিছুই মনে রাখতে পারো না, তাহলে বিয়ে করতে গেছিলা কেন? তোমাকে বিয়ে করতে বলছিল কে? সেটাও ভুলে যেতে পারলা না! নজরুলের মত লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় গান করে বেড়াতা!

আমার বাবার নানা রকমের বন্ধু ছিল। তারা সকলেই বিশ্ববিখ্যাত বাউন্ডুলে আর পেশায় গীতিকার, সুরকার কিংবা গায়ক। এজন্য কিছু ঘটলেই আমি তাকে নজরুলের মত লেটো গানের দলে যোগ দিতে বলতাম।

তাছাড়া, পড়ালেখা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করত আমার যে বাপ, সে নিজে কিন্তু মোটেও কোনো ভাল স্টুডেন্ট ছিল না। আমার ফুপুর কাছে শোনা, এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বাপ বাড়ির সামনের রেললাইনের ওপরে শুয়েছিল। পরীক্ষা দেয়ার চাইতে প্রাণ যাওয়া তার কাছে উত্তম মনে হয়েছিল। পরে আমার বাপের বাপ তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাসায় নিয়ে আসে।

আরো পড়ুন: শার্লক হোমস / পারমিতা হিম

সময় গড়াতে গড়াতে দেখি, বাপের এ ভুলে যাওয়া স্বভাব বিলকুল আমার মধ্যে কপি পেস্ট হয়ে গেছে। আমার ছোট বোন প্রায় বিশ দিন ধরে তার পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড প্রিন্ট করে আনার জন্য আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছে। আমি বাসা থেকে বেরুলেই আমাকে ফোন করে মনে করিয়ে দেয়। মেসেজ পাঠায়—আজকে কিন্তু আনতেই হবে!
আমি যথারীতি ভুলে যাই।

আজকে অফিসে ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে দেখি পাশের সহকর্মী একটা পিডিএফ ফরমেটের অ্যাডমিট কার্ড খুলেছে ওর কম্পিউটারে। ওটা দেখে আমিও আমার মেইল খুলে তিথিরটা ডাউনলোড করে একটা কপি নিলাম। বাসায় ফিরে সেটা তিথির হাতে দিতেই ও বলল, ওরে বাপরে! কীভাবে আনলা! আমি তো ভাবছি, আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাবার পরে কোনোদিন হয়ত ভর্তি পরীক্ষার কাগজটা হাতে পাব!

মন খারাপ করে ভাবছি, বাপকে দেওয়া খোটাগুলো এখন আমাকেই আবার শুনতে হচ্ছে! এর মধ্যেই মনে পড়ে গেল, আজ মধু পুর্ণিমার রাত। আজকে রাতে বাসায় থাকব, ঢাকায় থাকব, গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় নদীর পাড়ে পাড়ে হাঁটব না—ভাবা যায়!

কিন্তু, ঐ যে, আমি তো আজকের প্ল্যানপ্রোগ্রামের কথা ভুলেইই গেছি। আমার বন্ধুরাও আমাকে রাগ করে আর ফোন করে নি। কারণ আমি প্রায় সময়ই ওদের সাথে প্রোগ্রাম সেট করে, যাওয়ার দিন বিলকুল ভুলে যাই!

স্যার

শিক্ষকদের কান ধরানোমূলক শাস্তির উপর আমার কোন ক্ষোভ নাই। এমন না যে আমার টিচার আমাকে কখনো কান ধরান নাই।

কান ধরাইলে কানে সুড়সুড়ি লাগে, আর তাই আমার তখন খুবই হাসি পায়। এবং এই শাস্তি আমি খুবই পছন্দ করতাম। আমার আনন্দ হইত, আর আরো বেশি আনন্দ হইত যখন একজন আরেকজনের কান ধরে দাঁড়াইয়া থাকতাম।

তাই আমাকে সবচেয়ে বেশিদিন পড়াইছেন যে স্যার, মিঠু স্যার তিনি কিন্তু আমারে কখনো কান ধরাইতেন না। ধরাইতেন, নাক। এবং নাক ধরে দাঁড়ায়ে থাকা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাকর শাস্তি।

আমি স্যারের কাছে পড়া শুরু করছি ক্লাস ফোরে। এবং কলেজ লাইফ পর্যন্ত পড়ছি। স্যার পড়াইতেন ডিগ্রির ইংলিশ। আমি ডিগ্রি ক্লাশের সাথে ইংরেজি পড়া শুরু করি। আমার বোন ও তার বান্ধবীরা মিলে প্রথম স্যারের কাছে কলেজের ব্যাচে পড়া শুরু করে। আমি ওদের সাথেও পড়তাম। মানে সকাল থেকে যত এইচএসসি, ডিগ্রি ক্লাশের ইংরেজি ক্লাশ হইত, সব ক্লাশে আমি পড়তাম। এবং সবসময়ই সবার চেয়ে ভালো করতাম প্রাইমারি ক্লাশের আমিই।

logo paromita

আমি আসলে স্যারের বাসাতেই থাকতাম। সেখানে ঘুমাতাম। খাইতাম। নাচতাম। গান গাইতাম। স্যারের যখন বিয়ে হয় নাই, তখন তার রুমমেটদের নয়নের মণি ছিলাম আমি। আইসক্রিম, চকলেটের অভাব হইত না।

স্যার যখন বিয়ে করল, তখন আমার স্যারি, মানে স্যারের বউয়ের পিছে পিছে সারাদিন থাকতাম আমি। ঢাকার মেয়ে চট্টগ্রামের লোকদের ভাষাই তো বোঝে না। আমি ছিলাম তার এক নম্বর অ্যাসিস্ট্যান্ট। স্যারের চেয়েও বেশি আমার সাথেই ছিলো তার সংসার।

মুশকিল হইত আরেক জায়গায়। ভাইয়া আপুদের সাথে পড়ি। তাই ওরা যখন আমার কাছ থেকে দেখতে চায়, আমি তো আর না বলতে পারি না।

একদিন দেখাইতে গিয়ে স্যারের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলাম। তারপর স্যার আমাকে নাক ধরে দাঁড় করায়ে রাখলেন।

সবাই হাসল। আমার সজারুর মত খাড়া খাড়া চুল আরো খাড়া হয়ে গেল। নাকের ডগা অপমানে ফুলে গেল। আমার মান অপমান জ্ঞান তখন এত টনটনে যে চোখের কোণায় পানি চলে আসা সত্ত্বেও এক ফোটা পানিও আমি পড়তে দিলাম না। দৌড়ে বাসায় চলে আসলাম।

২.
এক সপ্তাহ ধরে পড়তে যাই না। আমার দিদি এসে বলে, স্যার যেতে বলছে। আমি মুখ বাঁকায়ে বলে দেই, উনাকে বলে দিও আমি আর যাবো না।

আমি সত্যি সত্যি যাই নাই। পাড়ায় পাড়ায় টো টো করার অভ্যাস ছিল। স্যারের বাসা যেদিকে ওদিকে ঘুরাঘুরি করাও বন্ধ করে দিলাম।

সাত দিন পর স্যার আমাদের বাসায় আসলেন। সাথে একটা অসম্ভব সুন্দর ছোট্ট আর রাগী চেহারার পুতুল বিড়াল। (আমাকে বিলাই ডাকত অনেকেই)।

স্যার, ওইটাই হইল আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহার। বাসা বদলের সময় যখন ওইটা হারায়ে গেল, আমি এত কষ্ট পাইছি, আর কোনো কিছু হারায়ে এত কষ্ট পাইছি বলে মনে পড়ে না।

যাই হোক, স্যার এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন পড়তে যাই না! আমি চুপ করে থাকলাম। শেষে বললাম, আমার অপমান লাগছে তাই আমি আর যাব না। আপনি কান ধরাইতেন, নাক ধরে দাঁড় করায়ে রাখলেন কেন? আমাকে দেখে হাসলেন কেন?

স্যার তখন নিজের নাক ধরে আমাকে বললেন যে আর কোনোদিন আমাকে নাকে ধরাবেন না। এই শর্তে আমি আবার পড়তে যেতে নিমরাজি হলাম।

কিন্তু গেলাম না। মান সম্মান একটু কমে যাওয়ার পর আবার যাওয়া শুরু করলাম।

তার মানে এই না যে এতগুলা বছরে উনি আমাকে আর নাকে ধরান নাই। অসংখ্যবার ধরাইছেন।

আচার খেয়ে উনার খাটের চিপায় বিচি ফেলে ফেলে আবর্জনার স্তুপ করে ফেলছিলাম (আমি একা করি নাই)। সব কিছু—চিপস, চকলেট, পাখির ডিম সব কিছুর প্যাকেট ওখানে ফেলে দিতাম। স্যারের বুয়া যখন একদিন ঝাড়ু দিয়ে সব ময়লা বের করে দেখালেন, তখন স্যার আমাকে নাক ধরে দাড় করায়ে রাখলেন দরজার বাইরে।

এছাড়া, বিশৃংখলা সৃষ্টির অভিযোগে কত শাস্তি আমি পাইছি! কেরাত বেতের মাইরও খাইছি। এবং কতবার পালায়ে গেছি। অভিমান করে আসি নাই। স্যারকে ত্যাগ করছি। স্যার আবার বাসায় এসে বুঝায়ে সুঝায়ে অভিমান ভাঙ্গাইছে।

আবার বাসা থেকেও অনেকবার পালায়ে গেছি আমি। মা মারত, রাগ করে বাসা থেকে চলে যেতাম। কই আর যাব! ঘর থেকে দুই পা ফেলিয়া স্যারের বাসা, সেখানেই থেকে যেতাম। তিন চার দিন পর বাবা এসে বুঝায়ে সুঝায়ে নিয়ে যাইতেন আবার বাসায়।

৩.
নয় বছর স্যারের কাছে পড়ছি, কোনোদিন স্যার এক টাকা নেন নাই। আমি ছিলাম স্যারের সর্বকালের সর্বপ্রিয় স্টুডেন্ট। এবং স্যারের কোচিং-এর সব বিদায় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। নাচতামও আমি, গাইতামও আমি। কবিতাও পড়তাম। এগুলা আমার জীবনকে কত আগাইছে, আমার সমসাময়িক যে কোনো মেয়ের সাথে তুলনা করলেই বোঝা যায়।

স্যার, ভাবছিলাম কোনো একদিন এই সব স্মৃতি আমার বইয়ে লিখব। আজকে এখানেই লিখে ফেললাম। আপনার সাথে পরিচয়ের শুরুতে একটা শয়তানি করছিলাম। আজকে সবার সামনে সেটা স্বীকার করেই ফেলি।

mithu-ahmed-1
আমার স্যার মিঠু আহমেদ।—লেখক

আমার মহাসুন্দরী বোনের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তার কোচিং-এ গিয়ে বসে থাকতে হইত। আমি তখন ফোরে পড়ি। মিঠু স্যার একদিন কাকে যেন বাসার ঠিকানা দিচ্ছেন। কথায় কথায় শুনলাম, তার বাসা আমাদের এলাকাতেই। বাসার সামনে নীল গেইট আর একটা পেঁপে গাছ আছে।

আমার খুব টো টো করার অভ্যাস ছিল। পরদিন দুপুরে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে স্যারের সেই পেঁপে গাছওয়ালা বাসা খুঁজে বের করে ফেললাম। গেইট খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি বাসার দরজা বন্ধ। জানালা খোলা।

উকি দিয়ে দেখলাম, স্যার একটা নীল গেঞ্জি আর বার্মিজ লুঙ্গি পরে ঘুমাচ্ছেন। ঘরে একটা ওয়ারড্রব, একটা টেবিল, একটা খাট আর জুতা রাখার তাক। তারপর বাইরের পেঁপে গাছটা ভালো করে দেখলাম। ৪টা পেঁপে ধরে আছে।

পরদিন বিকালে কোচিং এ গিয়ে খুব ভাব নিয়ে স্যারকে বললাম,স্যার আপনাকে আমি স্বপ্নে দেখলাম কালকে। আপনি নীল গেঞ্জি আর বার্মিজ লুঙ্গি পরে ঘুমাচ্ছেন। আর আপনার রুমে একটা ওয়ারড্রব, একটা টেবিল। আর আপনার বাসার সামনে একটা পেঁপেগাছ, সেখানে চারটা পেঁপে।

স্যার হা হয়ে গেলেন! চিৎকার করে সবাইকে বললেন, আল্লাহ, আমার বাসা তো হুবহু এরকম! কী চমৎকার! কী অদ্ভুত!

আমার দিদি কিন্তু আমার শয়তানি ঠিকই বুঝল। কিন্তু আমার কাছে তার নানা গোপন কথা বন্ধক থাকায়, চোখের ইশারাতেই তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ফেললাম আমি। সে একটা কথাও বলল না। স্যার আমাকে উনার ডিগ্রী ব্যাচে পড়তে বসায়ে দিলেন।

সেই শুরু!

স্যার, আমার সেই মিথ্যা কথার জন্য আমি আবার নাকে ধরতে রাজি আছি কিন্তু।

দুর্গাপূজার ছুটিতে

তখন দুর্গাপূজার ছুটিতে আমরা সবসময় দাদুর বাড়ি যাই। শুধু আমরা না, দাদুর চোদ্দগুষ্টির সবাই তখন ওই বাড়িতে যায়। আর বিশাল বিশাল বিছানা করা হয়।

আমার দাদুর বাড়ি মোটামুটি জমিদার বাড়ি। সেইখানে সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা রুম। বিশাল বৈঠকখানা, খাবার ঘর, রান্না ঘর—তার মধ্যে আবার একটা গ্যাসের চুলার ঘর, একটা মাটির চুলার ঘর, নিচে শোবার রুম কম—দুইটা। বাকিগুলা উপরে। নিচে লাকড়ি রাখার ঘর আছে। পাশেই একটু দূরে গরুদের রুম, ছাগলদের রুম, আবার খড় রাখার রুম—রুমের শেষ নাই।

আমরা গেলে থাকতাম উপরে। উপরে একটা ঘণ্টার রুম, একটা পূজার রুম আর চারটা শোবার রুম। এর মধ্যে একটাকে আমরা মানে বাচ্চাকাচ্চা-কিশোর-নওজোয়ান—এদের রুম বানায়ে ফেলছিলাম।

ওই রুমে কিছু ছিল না। মেঝেতে লম্বা করে চাটাই বিছানো ছিল। সেইখানে আমরা সবাই যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক তারা শুয়ে বসে আন্তাসারি খেলতাম। সেই নানা বয়সীদের মধ্যেও নানা রকম গ্রুপিং ছিল। আমার গ্রুপিং ছিল রিয়েল মামার সাথে। যদিও সে আমার মামা, কিন্তু বয়স তার খুব বেশি না। সে আর আমি সবসময় মিলিটারি প্যান্ট পড়তাম। আর জিন্সের শার্ট ছিল আমাদের বেশি প্রিয়। অবশ্য আমার মা আমাকে বেশিরভাগ সময় লাল টিশার্ট আর নীল জিন্স পড়ায়ে রাখত। তারপরেও সুযোগ পেলেই আমরা আর্মি মিলিটারি সেজে থাকতাম। এমনকি চুলও কাটতাম ওইরকম গলাছিলা মুরগির মতন করে।

আমাদের সবচেয়ে খাতির ছিল ঘুরাঘুরির ব্যাপারে। ঘুরতে—জায়গা না চিনে, কোনো কিছু না জেনে, গন্তব্যহীনভাবে মাইলের পর মাইল হাঁটতে আমাদের কোনো জুড়ি ছিল না।

সে সময়ের আমি।—লেখক

দাদুর যে গ্রাম—আনোয়ারা জয়কালীহাট, সেটা একটা অসাধারণ সুন্দর গ্রাম। কাফকো আর পারকির চরের খুব কাছেই। আমি আর রিয়েল মামা প্রতিদিন নানা জায়গা ভ্রমণ করতাম। সূর্যাস্তের সময় আমরা দিগন্তবিস্তৃত মাঠের ওপর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতাম—সূর্যকে ধরার জন্য। সূর্যকে ধরতে পারতাম না কখনোই কারণ হয় আমরা হাঁপায়ে যেতাম, না হয় আমাদের সামনে কোনো একটা জলাপুকুর এসে পড়ত। তবে আমাদের মনে দৃঢ়বিশ্বাস ছিল একদিন ওই ব্যাটাকে ধরবোই। আর রাত হতে দিব না।

সূর্যের সাথে শত্রুতার একটা কারণ ছিল। সকাল বেলা উঠে তো আমরা পূজামণ্ডপে যেতাম। সেখানে ঢাক ঢোল বাজায়ে, পূজা অর্চনা করে আমাদের সময় কেটে যেত। দুপুরে খেয়ে দেয়ে সবাই যখন ঘুমাত, আমরা পা টিপে টিপে বের হতাম নতুন জায়গা আবিষ্কারে। ফিরতাম সন্ধ্যার আগেই। বাসায় না ফিরে পূজামণ্ডপেই যেতাম। সেখানে সন্ধ্যা থেকেই ঢাক ঢোল বাজায়ে, ধূপ ধুনো নিয়ে বেশ নাচানাচি হত।

আমরা গিয়েই নাচানাচি শুরু করে দিতাম। কেউ কিছু টেরই পেত না। ওই গ্রামে আমার কয়েক হাজার মামা ছিল। সবাই আমাদের জামায় সেফটিপিন দিয়ে টাকা আটকায়ে দিত। খুব বেশি না, হয়ত দুই টাকা, পাঁচ টাকা—কিন্তু তাতেই আমরা মহাখুশি হইতাম। দশটার মধ্যে বাসায় ফিরে টাকা গোনা শুরু করতাম।

বিদ্যুৎ নাই এমন একটা গ্রামে রাত দশটা মানে অনেক রাত। অবশ্য দাদুবাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল কিন্তু সেটা কখনোই রাতে থাকতো না। আমরা শহরে থেকে অভ্যস্ত। রাত দশটায় আমাদের ঘুম আসা অসম্ভব। বাইরে নানা পোকামাকড়ের ডাকাডাকি। নিঝুম নীরব একটা জায়গা। কিছুই করার নাই। তার চেয়ে দিনের বেলাই ভালো। কিছু না কিছু হইহল্লা চলতে থাকে। তাছাড়া হারিকেন, কূপি এইসবের আলোয় আমার ভয়ানক ডিপ্রেসন হয়। সহ্য করতে পারি না আমি। রিয়েল মামারও বোধ হয় এ অবস্থা। সেইজন্য সূর্যকে ধরার জন্য আমরা এত ব্যাকুল ছিলাম। কত সূর্যাস্তের সময় আমরা ওই ব্যাটার পিছে পিছে দৌড়ে গেছি!

কলকাতায় দেবী দুর্গার প্রতিমা

সেদিন সপ্তমী দিন। সন্ধ্যায় গেছি পূজামণ্ডপে। দেখি কারা যেন বলাবলি করছে ‘সিঙ্গারা’ গ্রামের পূজাই (মানে প্রতিমাই) সবচেয়ে সুন্দর হইছে। আমার মামাদের খুবই মন খারাপ। তারা বলতে শুরু করল যে আমাদের গ্রামের লোকজন টাকাই দেয় না। তাই পূজাও সুন্দর হয় না। শাড়িটা আরেকটু দামি কিনতে পারলেও হত। প্রতি বছরই এইসব আলোচনা হয়। কিপটামির এইসব অভিযোগ চলতেই থাকে। তাই আমরা এসবে একটুও আগ্রহ পাইলাম না। আগ্রহ হল ‘সিঙ্গারা’ নামটাতে।

আমরা বললাম—সিঙ্গারা কী? গ্রাম?

মামারা বলল—হ ওই পাশের একটা গ্রাম।

আমি আর রিয়েল মামা তো মহাখুশি।

—গ্রাম? গ্রামের নাম সিঙ্গারা?

—হুমম, গ্রামের নাম সিঙ্গারা।

আমার আর রিয়েল মামার চোখে চোখে বোঝাপড়া হয়ে গেল কাল আমরা ঘুম থেকে উঠেই ওই গ্রামে রওয়ানা দিব। পূজার ঝামেলায় আমাদের কেউ খুঁজবেও না।

পরদিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে ভাল জামা কাপড় পরে, খেয়েদেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম সিঙ্গারা গ্রামের দিকে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। ভাবল আমরা মণ্ডপে যাব। আগের দিন পাড়াতো মামা যেদিকে মাথা নেড়ে ‘ওইদিক’ দেখাচ্ছিল সেইদিকে দুজনে হাঁটা দিলাম।

সুন্দর পিচঢালা রাস্তা। মাঝে মাঝে দুএকটা লক্করঝক্কর বাস কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যায়। দুপাশে ক্ষেত, পুকুর, গাছ, জঙ্গল। আরো অনেক কিছু মিলে ঝিলে আমরা ‘ওইদিকে’ হাঁটতে থাকলাম। মাঝে মাঝে দোকান পেলে সেখানে পানি বিস্কুট পুরি এইসব খেলাম। নাচানাচি করে আমরা তখন অনেক টাকার মালিক। সেগুলাই খরচ করলাম। কিন্তু সিঙ্গারা গ্রামের দেখা নাই।

পথে যতজন পাইলাম জিজ্ঞাসা করলাম—আর কতদূর?

তো তারা বলে, আর বেশি না আধা ঘণ্টার মতন লাগবে। কেউ বলে, দশ পনের মিনিট লাগবে।

পথচারীরা যে কী হিসাবে পথের দূরত্ব বলে আমি আজো বুঝি না! আমার মনে হয় তাদের যা মনে আসে তাই বলে দেয়। অজানা অচেনা মানুষের কাছে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করতে ভালো বোধ করে না হয়ত। তাই যা খুশি তাই বলে। বাস্তবতার সাথে মিল না রেখেই।

আমার দূরত্ব মাপার ক্ষমতা এখনো অনেক কম। আমি বাপু সরাসরি বলে দেই যে আমি বলতে পারব না কতদূরের পথ। কত সময় লাগবে। ধরেন কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার বাসা কত স্কয়ার ফুট? আমি কিছুক্ষণ হা করে বলে দেই যে, আমি জানি না।
ধারণা? না না আমার এইসব ফুট ইঞ্চির ধারণা নাই।

কিন্তু আমাদের কপালে যেইসব পথচারী পড়ল তারা সকলেই বলল আর মাত্র আধাঘণ্টার পথ। দুই ঘণ্টা ধরে আমরা সেই আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলাম। তারপর যখন সব আশা ছেড়ে দিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসে হাঁপাতে শুরু করছি, ঠিক সেই সময় দেখলাম আমার মাথার উপরে দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা—‘সিঙ্গারা, আনোয়ারা’।

একই গ্রাম। একই সবুজ। একই পুকুর। একই ঘরবাড়ি। একই ভাষা। একই মানুষ। আচ্ছা এই পাশেরই তো গ্রাম। সব একই হবে সেটাই স্বাভাবিক।

আমি বললাম, সিঙ্গারা খেয়ে দেখি। সিঙ্গারা গ্রামে এসে সিঙ্গারা না খেলে কি মজা!

তো একটা সিঙ্গারার দোকান খুঁজে বের করতেও আরো অনেকদূর যেতে হল। দেখলাম সিঙ্গারাগুলো আমাদের গ্রামের সিঙ্গারার চেয়ে বড় সাইজের। অনেক আগ্রহ নিয়ে খেলাম আমরা দুইজন। পুরো পথ খেতে খেতে আমাদের পকেটের টাকা প্রায় শেষ। কিন্তু বিধি বাম! সিঙ্গারার ভেতরে শুধুই আলু, সিঙ্গারা গ্রামের সিঙ্গারাও শুধুই যে কোনো সিঙ্গারা! দুইজনে এত বিরক্ত হলাম বলার মত না।

এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কোনো কিছুই অন্যরকম না পেয়ে আমরা বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম। দুপুর তখন শেষের দিকে। ধীরে ধীরে নরম হয়ে যাচ্ছে রোদ। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। এখন ফেরা মানে নির্ঘাৎ ধরা। নানারকম কৈফিয়ত দিতে হবে। কারণ দুপুরের খাবারের সময় পার হয়ে গেছে। সবাই জানে যে আমরা বাসায় যাই নি। মণ্ডপেও নিশ্চয় খোঁজ নেয়া হয়ে গেছে।

আমরা দুজনে মিলে বুদ্ধি বের করলাম আগে মামার দোকানে যাব। সেটা দাদুর বাড়ি পার হয়ে আরো বিশ মিনিটের পথ। সেখানে আমরা প্রায় সময়ই যাই। আমি তো রীতিমত দোকানদারি করি। একদিকে পান বেচি আরেকদিকে ক্যান্ডি খাই। ভাবলাম কিছুক্ষণ দোকান থেকে ঘুরে আসলে বাসায় গিয়ে কৈফিয়ত দিব যে আমরা সাতসকালে মামার দোকানে চলে গেছিলাম।

মামার দোকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একদম বিকেল পার হয় হয় অবস্থা। মামা নাই। কর্মচারী মামা আছে।

—মামা কই? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

কর্মচারী মামা খুব ব্যস্ত হয়ে বলল, কীরে তোমরা কোত্থেকে? কোথায় গেছিলা?

আমরা মিটি মিটি হেসে বললাম—এক জায়গায়।

উনি দোকান থেকে ঘাড় ধরে আমাদের বের করে দিলেন। বললেন, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও।

আমরা বললাম, মামার সাথে দেখা করে যাই।

উনি চিৎকার করে বললেন, সবাই তোমাদের খুঁজে খুঁজে অস্থির। এক্ষুনি বাসায় যাও। বলে দশ টাকা দিলেন হাতে। আর বললেন, রিকশা নিয়ে যাও।

কে আর যায় রিকশা নিয়ে! দশ টাকার চকচকে নোট এমনি এমনি হাতে চলে আসা কি সহজ ব্যাপার! তাছাড়া হাজিরা যখন দেয়া হয়েই গেছে, তাড়াহুড়া করে যাবার দরকার কী আর! আমি আর রিয়েল মামা হেলেদুলে গল্প করতে করতে, রাস্তার ফুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে, ফুল ছিঁড়ে মধু খেতে খেতে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

সেদিন মহাঅষ্টমী। যেসব পাড়ায় পূজামণ্ডপ আছে সেখানে মাইকে মাইকে ঢাক-ঢোল-কাঁসার শব্দ কিংবা ভজন সঙ্গীতবাজছে। কে কান দেয় সেসবে! আমরা আমাদের নানা গল্প করতে থাকি।

পুকুরের মধ্যে একটা বেগুনী রঙের অদ্ভুত ফুল দেখিয়ে রিয়েল মামা আমাকে বলল, এটা কী ফুল জানিস? ধুতুরা ফুল। খুব বিষাক্ত। এটা যদি কাউকে খাওয়াতে পারিস সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবে।

আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম, তাহলে দাঁড়াও। নিয়ে যাই কয়েকটা।

রিয়েল মামা অবাক হয়ে বলল, কেন?

আমি বললাম, আমার শত্রু আছে না অনেক! কেউ যদি আমার সাথে বেয়াদবি করে একদম খাওয়ায়ে দেব। হাহাহাহ।

রিয়েল মামা আমার হাত ধরে কিছু দূর জোরে হেঁটে টেনে নিয়ে গেলেন, তুই একটা ডেন্জারাস মেয়ে বাবা।

কেন, আমি কী করলাম? আমার বিরক্তসূচক প্রশ্ন।

পৃথিবীর কোন মেয়ে শত্রুদের মেরে ফেলার প্ল্যান করে? কী সাংঘাতিক কথা! তোর এমন কী শত্রু?

আমি বললাম, বারে, এই যে আমার ক্লাসের রাজীব। বোম্বাই ফাইট খেলার সময় কাগজের ভেতর পেঁয়াজু ভরে ভরে আমার দিকে মারে! আমি ব্যথা পাই না? ওকে যদি আমি পেঁয়াজুর সাথে ধুতরা দিয়ে দেই, ও যদি মরে সাথে সাথে—তাহলে আমার ক্লাসের অন্য ছেলেদের একটা উচিত শিক্ষা হবে না?

রিয়েল মামা খুব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। আমরা তখন বাড়ির কাছাকাছি। পূজামণ্ডপের মাইকে কী কী যেন বলছে। একটু একটু শুনতে পাচ্ছি।

রিয়েল মামা বলল, তোর মত ঝগড়াটে মেয়ে আমি জীবনেও দেখি নাই একটাও। আর ওইটা কীরকম চোখ? মানুষের চোখ কী ওরকম হয় নাকি? কুকুর বিলাইয়ের চোখ ওরকম হয়।

আমি বললাম, মানুষের চোখ একশবার এরকম হয়। কত মানুষের চোখই তো এরকম। সব মানুষের চোখ কি কালো হয়?

রিয়েল মামা বলল, শয়তানদের চোখ এরকম হয়। ঘোলাটে। ব্রেইনের সব শয়তানি প্যাঁচ খেয়ে চোখ ঘোলা করে দেয়।

এমন সময় শুনলাম, মাইকে বলল, মেয়েটার চোখের রঙ বাদামি।

আমি চিৎকার করে বললাম, ওই যে মাইকে কী বলে শোন। একটা মেয়ের চোখের রঙ বাদামি। হাহ্।

রিয়েল মামা মাথা নেড়ে বলল, অসম্ভব। পৃথিবীর কোনো মেয়ের চোখ তোর মত না। তুই আর বিলাই আর কুত্তা এরা হইল এরকম চোখের।

আমি মাইকের মেয়েটার কথাটা আরো ভালভাবে শোনার জন্য দৌড়াতে থাকলাম মণ্ডপের দিকে। আমার পেছনে পেছনে রিয়েল মামাও দৌড়াচ্ছে। কাছাকাছি আসতেই স্পষ্ট শোনা গেল মাইকের ঘোষণা, “…বয়স দশ। পরনে লাল গেঞ্জি। নীল জিন্সের হাফপ্যান্ট। মেয়েটির চোখের রঙ বাদামী। বয়কাট চুল…।”

আমি তো খুবই উত্তেজিত হয়ে গেলাম। সবই একদম আমার সাথে মিল! আমি রিয়েল মামার দিকে তাকিয়ে একটা বিজয়ীর হাসি দিলাম।

ওদিকে মাইকে বলেই যাচ্ছে, “…নাম পারমিতা। বয়স দশ। পরনে লাল গেঞ্জি। নীল জিন্সের হাফপ্যান্ট। মেয়েটির চোখের রঙ বাদামি। বয়কাট চুল। ছেলেটির নাম রিয়েল। বয়স এগার। পরনে হাফহাতা সবুজ শার্ট। কালো প্যান্ট।…”

“…মিলি ও রিয়েল… তোমরা যেখানেই থাকো না কেন অতি সত্বর বাড়িতে আসো। তোমাদের বাবা মা তোমাদের জন্য দুশ্চিন্তা করছেন। তোমাদের মায়েরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।…”

“…একটি নিখোঁজ সংবাদ… একটি নিখোঁজ সংবাদ… একটি নিখোঁজ সংবাদ’।

এইটুকু শুনে তো আমাদের মাথায় বাজ পড়ল। দুইজনে পড়িমরি করে দৌড় দিলাম মণ্ডপের দিকে। মাইকিং করে আমাদেরকেই খোঁজা হচ্ছে এইটুকু বোঝার পর আমাদের হার্টবিট ঘোড়ার মত দৌড়াচ্ছে।

মণ্ডপের গেইট দিয়ে দৌড়ে ঢুকতেই দেখি আমার মা বাবা দুজনে গম্ভীর মুখে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো। রিয়েল মামার বাবা সেখানে নাই। উনার মা দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার করে গড়াগড়ি কাঁদছেন। আর আমার মা ধূলায় গড়াগড়ি যাওয়া তো দূরে থাক, তার শাড়ির কোথাও এতটুকু ভাঁজও পড়ে নি।

মার লাল চোখ দেখেই বুঝে গেলাম আমার কপালে আজকে জন্মের পিটুনি আছে। সে আমার দিকে একবার আগায়েও আসল না। এদিকে রিয়েল মামার মা তো তাকে জড়ায়ে-টড়ায়ে ধরে সে কী কান্না। ছেলেকে মিনিটে তিরিশটা করে চুমু খাচ্ছে। রিয়েল মামারা দুই ভাই। মানে তার মায়ের দুই মাত্র ছেলে। সুতরাং ছেলের অনেক খাতির তার মায়ের কাছে। আর আমার মায়ের তখন তিন মেয়ে। আমার জন্য তার কোনোই মায়া-দয়া নাই। আমার দিদিমারা আমাকে জড়ায়ে ধরে আছে। আদর করছে। আর জিজ্ঞাসা করছে, কোথায় ছিলি তোরা? কোথায় গেছিলি?

আর আমার মা দূর থেকে চোখ লাল লাল করে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকায়ে আছে। জড়ায়ে ধরা, কান্না করা অনেক দূরে থাক। আমি মনে মনে ভাবলাম, মাকেই খাওয়াতে হবে ধুতুরা ফুল। এরকম নিষ্ঠুর সে!

দুর্গার সাজে

দিদিমাদের উত্তর দিলাম, মামার দোকানে।

ওরা বলল, দোকানে তিনবার লোক পাঠানো হইছে। তোর মামা দোকান ছেড়ে এখন রিয়েলের বাবাকে নিয়ে তোদের খুঁজতে বের হইছে। গ্রামে গ্রামে রিকশায় করে মাইকিং হচ্ছে।

দুজনকে প্রায় কোলে করে বাড়িতে আনা হইল। সারাদিন খাওয়া হয় নাই। সবার আগে আমাদেরকে খাওয়ানো হবে। আমার মা কিছুতেই এখন খাইতে দিবে না। উনি আগে আমাকে গোসল করাবেন। নিচের কলের পাড়ে যে বাথরুম আছে ওইটাতে স্নান করায়ে তারপর খেতে দিবেন। আমি এক মিনিটে বুঝে গেলাম উদ্দেশ্য কী।

নিচের কলপাড়ের বাথরুম মূল বাড়ি থেকে অনেকটা বাইরের দিকে। সেইখানে আমরা স্নান করি না। সেইখানে নিয়ে পানি ছেড়ে দরজা বন্ধ করে আমারে একটা আচ্ছাসে মাইর দেয়া হলো আমার মায়ের উদ্দেশ্য। সবার সামনে তো আমাকে মারতে পারবে না। দাদু দিদিমা আছে। এরা ধরে ফেলবে। মামা আছে। মামি আছে। কিছুতেই মনমত মাইর দিতে পারবে না। তার চেয়ে ওই কলপাড়ে নিয়ে যথেষ্ট প্রাইভেসির সাথে মাইর দিবে। কেউ দেখবেও না কিছু বলবেও না। আমি নানাননানান করে জানায়ে দিলাম আমি কিছুতেই ওইখানে ওই বাথরুমে স্নান করতে যাব না। যদি যেতেই হয় তাহলে একা যাব। মাকে স্নান করাতে হবে না।

এদিকে মাও একগুয়ে। স্নান না করলে সে আমাকে বাড়ির ভেতরেই ঢুকতে দিবে না। খাবারের ঘর তো অনেক দূর। আর আমাকে একা পাঠালে আমি অভিনয় করে মাথা ভিজায়ে চলে আসব। এই ভরসন্ধ্যায় আমি কিছুতেই গায়ে পানি ঢালবো না, তাই মা আমার সাথে যাবে।

আমার মায়ের প্রবল শুচিবায়ু। অন্যরা সেটা জানত। তাই কেউ কিছু সন্দেহ করল না। আমার প্রবল নিষেধ আর মাথা নাড়ানাড়িকে উপেক্ষা করেই কলপাড়ের বাথরুমে আমাকে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগায়ে আচ্ছাসে পিটানো হলো। আধা ঘণ্টা পর আমাকে যখন সাইজ করে খাবারের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল আমি তখনও ফোঁপাচ্ছি। দেখলাম রিয়েল মামা মহাসুখে পিঠা পায়েস খাচ্ছে।

মনে মনে দুইটা ধুতুরা ফুল বরাদ্দ দিলাম। একটা আমার মায়ের জন্য। আরেকটা ওই রিয়েল মামার জন্য। ভাবলাম দশমীর আগেই দুইটা ধুতুরা ফুল আমি জোগাড় করে ফেলব।

পারমিতা হিমের আরো লেখা >>

শার্লক হোমস

দূরসম্পর্কিত এক মামার বিয়ে। আমরা গ্রামে দাদুর বাড়ি চলে গেলাম বিয়ের তিন চারদিন আগে। দাদুর বাড়ি তখন গিজ গিজ করছে লোকে। সবাই যার যার বয়েসীদের সাথে ঘুরছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। আমার মা ঘুরছে বউদের সাথে, কাজ করছে, রান্নাবান্না করছে, হাসিঠাট্টা করছে। বাবা ঘুরতো তার বয়সী সারাক্ষণ-গুরুগম্ভীর-আলোচকদের সাথে। দিদিও তার বয়সী ছোকরীদের সাথে সারাক্ষণ হাহাহিহিতে ব্যস্ত। বিধবা বুড়ি সব একসাথে পান ছেঁচে খাচ্ছে।

আমরা ডজন ডজন বাচ্চা একসাথে নাশতা করতাম। ভাত খেতাম। বিকালে খই মুড়ি খেতাম। আমরা পিচ্চিরা বেশ একটা স্বাধীন দল তখন। কিচিরমিচির করে করেই দিন শেষ। বিয়ের ধুমধাম আমাদের কাছে একটা বেশ পোশাক পরা ছাড়া আর কিচ্ছু না।logo paromita

আমার দাদুর বিশাল বাড়ি। এক কোণায় থাকলে আরেক কোণার খবর পাওয়া যায় না। তার মধ্যে আবার তিন বিভাগ। ডাইনিং রুম, দুইটা রান্নাঘর (একটা মাটির চুলার, একটা গ্যাসের চুলার), আর স্টোর রুম এক বিভাগে। আরেক বিভাগে বিশাল বৈঠক ঘর আর দাদুর চেম্বার (হোমিওপ্যাথ) আর একটা শোবার রুম। দোতলায় সব অতিথিদের ঘুমাবার রুম। আরেক বিভাগে উপরে পূজার ঘর আর মামাদের ঘর। সে বিভাগের নিচের রুমগুলা স্টোর রুমের মতনই ব্যবহার করা হয়।

সুতরাং যত লোকই থাকুক, ওই বাড়িতে একটু না একটু খালি জায়গা তো পাওয়াই যায়। আমার দাদু খুবই অদ্ভুত মানুষ। সে প্রথমে এম.কম পাশ করে একটা ভাল কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসাবে যোগ দেয়। ওই চাকরি করতেই করতেই আরেকটা মাস্টার্স করে। বিষয়, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। এরপরে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি পড়া শুরু করে। সে পড়াশুনাও ভালমতনই করেছে। চাকরির পাশাপাশি সেই ডাক্তারির চর্চাও করত।

দাদু: নির্মল কান্তি দাশ - লেখক
দাদু: নির্মল কান্তি দাশ – লেখক

আমরা দাদুর ডাক্তারি পাত্তা দেই না। কিন্তু তার চেম্বারখানা আমার ভীষণ পছন্দ। সেখানে বিশাল সাইজের একটা ভিআইপি চেয়ার আছে, পুরাটাই পুরু ফোমে ঢাকা। আর তার বিশাল সাইজের বইয়ের তাকে রাজ্যের বই। বেশিরভাগ বই হোমিওপ্যাথ সম্পর্কিত। তার বাইরে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত বই। বাচ্চাদের জন্য এর চেয়ে হতাশাজনক বইয়ের তাক পৃথিবীর কোথাও নাই। তবুও সকালবেলা নাস্তা খেয়ে আমি ওই চেয়ারে গিয়ে শুয়ে থাকতাম। আর ওষুধের শিশি থেকে দুচারটা বড়ি খেয়ে নিতাম। ওগুলা বেশ মিষ্টি ছিল। আর খেলেও কিছুই হত না। মাঝে মাঝে স্বাদে বৈচিত্র্য আনার জন্য দাদুর মত করেই পাউডারের সাথে দু এক ফোঁটা তরল ওষুধ মিলিয়ে খেয়ে ওখানে বসে থাকতাম। গলায় স্টেথোস্কোপ। সমবয়সীরা মাঝে মাঝে আসত। ওদের হার্টবিট চেক করে দুটা মিষ্টি বড়ি খাইয়ে দিতাম। বড়রা কেউ এসব টেরও পেত না।

এইসব বিতলামি করতে করতে বইয়ের তাকটাও ঘাঁটতাম। ওই বয়সে ইসলামের ইতিহাস পড়তে কার ইচ্ছা করে? তবু কিছু তো পড়তে হবে! আমি হোমিওপ্যাথের বইগুলাই পড়তাম। সেগুলো খুব চমৎকার বাংলায় লেখা। এইসব বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন সেখানে শার্লক হোমস সমগ্র পেয়ে গেলাম।

বেশ সুন্দর লাল মলাটের একটা মোটা বই। পড়তে পড়তে আমিও যেন লন্ডন থাকি তখন। মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণায় পাইপ রেখে চিন্তা করি। কে অনুবাদ করেছিল জানা নাই, চমৎকার না হলে অত ছোটবেলায় এত ভালো লাগার কোনো কারণ নাই।

খাওয়া ছাড়া সারাদিন ওই রুমে বসে বসে বই পড়তাম। কেউ কোন খোঁজও নিত না। মায়েরও সারাদিন দেখা নাই। শুধু রাতে এসে বলে যেত কোন রুমে কার সাথে কে কে ঘুমাবে। সব বাচ্চারা এক রুমেই ঘুমাবে। সাথে থাকবে কোন জাঁদরেল বুড়ি। এই এক ব্যবস্থা আমার খুবই অপছন্দ ছিল। একে তো বাবা মা ছাড়া ঘুমানো। তার ওপর আবার শয়তান বুড়িদেরকে আমাদের সাথে শোয়ানো। আমি ওরম থুরথুরি বুড়িদের দুই চোখে দেখতে পারতাম না।

বুড়িদেরকে ভালবাসতাম না আমি। ছবিতে আমি এক বুড়িকে অনিচ্ছাসত্ত্বে জড়িয়ে। আরেকপাশে আমার ছোটবোন ঈশিতা। - লেখক
বুড়িদেরকে ভালবাসতাম না আমি। ছবিতে আমি এক বুড়িকে অনিচ্ছাসত্ত্বে জড়িয়ে। আরেকপাশে আমার ছোটবোন ঈশিতা। – লেখক

কারণ বিধবা বুড়িগুলো সাদা থান পরত, ব্লাউজ পরত না। তার ওপর চুলগুলা কেমন জানি বয়কাট করে রাখত। তারও ওপর, সবার সামনে বিড়ি ফুঁকত। বাকিগুলা ঠিক আছে, কিন্তু ব্লাউজ না পড়ার কারণে, বিশেষ করে তার ওপর স্বচ্ছ সাদা কাপড় পরে ঢ্যাংঢ্যাং করে ঘুরে বেড়ানোর কারণে এদের সাথে আমি মিশতে চাইতাম না। আমার ধারণা ছিল এরা সব আসলে ডাইনি বুড়ি। এজন্যই ওদের বুকের গড়ন ওরকম ঝুলে ঝুলে পড়া। আর হায়া শরম বলেও তো ওদের কিছু নাই! সবাই নিশ্চয়ই জানে এরা মানুষ টাইপের ডাইনি কিন্তু ভয়ে কিছু বলে না।

বিয়ের দিন সাজগোজের রুমে মায়ের দেখা পেলাম। দেখামাত্রই জানিয়ে দিলাম আমি আর বুড়িদের সাথে ঘুমাব না। আমার ভাল লাগে না। আমার মার কপাল কুঁচকে গেল। কী ভাবল কে জানে! আমাকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করল, কী সমস্যা ওদের সাথে?

আমি একসময় বলেই ফেললাম, ব্লাউজ পরে না কেন ওরা?

মা কী বুঝল জানি না। বলল, আচ্ছা যা ওদের সাথে ঘুমাতে হবে না। আজকে মনে হয় তোরা এ বাড়িতেই জায়গা পাবি না। অন্য বাড়িতে ঘুমাতে হবে।

আমি তার কথা অত পাত্তা দিলাম না। হই হই রই রই করে সময় চলে গেল। কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম মনেও নাই।

ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। ভোর মানে কি খুব একটা আলোই ফোটে নাই তখন। আমি চোখ খুলে দেখলাম একটা টলটলে পুকুর। কী যে সুন্দর সেই পুকুরটা! এত বছর পরেও খুব স্পষ্ট মনে পড়ে। পরিষ্কার পানি। পানির ওপরে দুএকটা কী লাল লাল ফুল ভাসছে।

সবচেয়ে ভালো বিষয় পুকুরটার কোনো পাড় নাই। উঠানের পরেই ওরম টলটলে পানি। উঠানটায় আবার একটু ঘাস, একটু মাটি। আমার ঘুম ঘুম লাগে। আবার এ স্বপ্নটাও ভাল লাগে। আরেকটু ভাল করে দেখতে চাইলাম। পুকুরের ওইপাশে লাইন ধরে বেশ কয়েকটা কলাগাছ। কলাগাছ এমনিতেই সুন্দর। তার ওপর সেগুলোর ছায়া পানিতে পড়ে পুরো জায়গাটাকেই কেমন মায়া মায়া করে ফেলেছে!

আহ স্বপ্ন! আরেকটু ভালো করে দেখি! তাই চোখ বুজলাম। চোখ বুজে দেখি সর্বনাশ! কিছু তো দেখা যায় না! চোখ খুলে ভাল করে দেখলাম। একটা বেড়ার ঘরে শুয়ে আছি। খুব সুন্দর বেড়াগুলো। যে পুকুরটা দেখতে পাচ্ছিলাম আমি, আমার এই ঘর থেকে সেখানে যাওয়ার দরজাটা একদম আমার চোখের সামনে। আমি এতক্ষণ দরজা ডিঙিয়ে পুকুরটাই দেখছিলাম।

এবার আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। আমি এখানে আসলাম কীভাবে? আমার মামার বাড়ি তো বেড়ার তৈরি না! ওটার আশেপাশেও কোনো বেড়ার বাড়ি নাই! নিশ্চয়ই আমাকে কিডন্যাপ করেছে কেউ। খুব আস্তে করে পাশ ফিরলাম। এমনভাবে ফিরলাম যেন ঘুমের মধ্যেই পাশ ফিরছি। আবছা আবছা চোখ খুলে দেখলাম ঘরে আর কেউ নাই। খুবই সাদামাটা ঘর। ওপাশে বেড়া ছিল আর এপাশে মাটি। মেঝেতে মাদুর বিছানো। ঘরটার দেয়ালে তাক অনেক। তাকে হারমোনিয়াম, তবলা একতারা এসব গুছিয়ে রাখা। আরেকটা দরজা আছে এদিকে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ওই দরজা দিয়ে অন্য আরেকটা রুম। তার মানে আমি সবচেয়ে কোণার রুমে বন্দি। যাতে আমাকে এ বাসায় খুঁজতে আসলেও পাওয়া না যায়।

কীভাবে এখানে আমাকে আনা হল বুঝলাম না। অজ্ঞান করে ফেলেছিল নিশ্চয়ই! যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো হয়েই গেছে! আমি শুয়ে শুয়ে এখান থেকে কীভাবে পালাবো ভাবছি। আর ভান করছি গভীর ঘুমের। এমন সময় একটা লোক এসে ঢুকল ঘরে। লোকটার বয়স বাইশ কি তেইশ হবে। লুঙ্গি পরা। সে এসেই আমার পাশে শুয়ে পরল। আমি তো পুরাই চোখ মুখ টাইট করে বন্ধ করে রাখলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ। সে কী যেন গুনগুন করছিল শুয়ে শুয়ে। একটা সময় লোকটা উঠেই পরল। আমার চোখ খুলে তাকানোর সাহস হল না। পুকুরের দিকটা থেকে হাঁসের প্যাকপ্যাকানির শব্দ শুনতে পেলাম।

তার মানে আরেকটু ফর্সা হয়ে গেছে বাইরে। আমার মা বাবা কি আমাকে খুঁজছে না? কী যে করি!

এমা কী এক বিষম আওয়াজ হঠাৎ! কানে লাগে এমন কর্কশ আর ঘ্যানঘ্যানে শব্দ। একটু পরই পুরুষ কণ্ঠের আআআআ… আমার তো মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। এক চোখ একটুখানি খুলে দেখলাম ওই লোকটা একটা তানপুরা নিয়ে আমার বিছানাতেই বসে আছে। চোখ বন্ধ করে ওটা বাজাচ্ছে আর আ…আ…আ… করছে। বড় আজব কিডন্যাপার! তবে এটা আমার ঘুম ভাঙানোর বুদ্ধিও তো হতে পারে। আমি চোখটা আরো টাইট করে বন্ধ করে ওপাশ ফিরে শুলাম।

আমার মনে তখন ভয়ের উত্তাল সাগর। ওরা কয়জন? কী করবে আমাকে? কিডনি বেচে দিবে? সৌদি আরব পাঠাবে? উটের জকি বানাবে? আমার আম্মা আমাকে খোজে না কেন? খুঁজলেও কেমনে জানবে আমি কোথায়? ওরা কি বেচে দিবে আমাকে?

ভাবতে আমার তন্দ্রামতন এসে গেল। আর সাথে সেই লোকের গলা সাধা তো আছেই। আবার যখন চোখ খুললাম, দেখি, একটা পাখি এসে বসল পুকুরের কাছে। উফফ কী সুন্দর একটা ঝলমলে সকাল। খুব স্নিগ্ধ বাতাস। আর কেমন একটা গন্ধ বাতাসে। সেই লোক গলা সেধেই চলেছে। আশ্চর্য! এখন আর ঘ্যানঘ্যানে মনে হচ্ছে না তানপুরার আওয়াজ। এমনকি লোকটা আআআআআ করে যা করছে সেটাকেও গানই মনে হচ্ছে। আশ্চর্য মায়ার সুর! কতক্ষণ ধরে শুনছিলাম কে জানে!

হঠাৎ এক মহিলা আমাকে চমকে দিয়ে বলল, ওর তো ঘুম ভেঙে গেছে তোর আওয়াজে! আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার মন থেকে তখনো সন্দেহ যায় নি।

মহিলার কপালে সিঁদুর, হাতে শাখা। মাত্রই স্নান করে এসেছে বোঝা যায়। হাতে একটা চায়ের কাপ।

লোকটাকে কাপটা দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আহারে বেচারা আরো ঘুমাবা? লোকটাকে মুখ ঝামটাও দিল, আরে কী শুরু করলা বাচ্চাটা ঘুমাইতে পারতেছে না, ওর সামনে রেওয়াজ করতেছো!

বাচ্চাদের ভিড়
বাচ্চাদের ভিড় – লেখক

লোকটা চা খেতে খেতে বলল, কী তোমার ডিস্টার্ব হল খুব?

আমি বললাম, না,না, আমার তো খুব ভালো লাগছে! আরেকটু গান। আর এইটার নাম কি? বীণা?

সে বলল, এইটা তানপুরা। উচ্চাঙ্গসঙ্গীত তোমার ভালো লাগতেছে! বল কী! এই বয়সে তো এগুলা ভালো লাগার কথা না!

আমি বললাম, না আসলেই ভাল। শুনি।

লোকটা অনেকক্ষণ আমাকে তার উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনাল। পুরোটা সময় জেগে ছিলাম না। তাকে আমি চিনতেও পারি নি। তবু এত ভাল লাগছিল যে চুপচাপ শুনছিলাম।

লোকটা খেয়াল করল, বলল, এটা রাগ ভৈরব।

আমি তাকে জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম, আপনি কে?

সে বলল, আমি তোমার কচি মামা। তুমি তো ক্লাবে ঢুলীদের ওখানেই ঘুমিয়ে গেছ। তোমার মা বলল তোমাকে নিয়ে আসতে তাই নিয়ে আসলাম।

আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার মামা তাহলে আমি চিনি না কেন?

মুখে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কীভাবে এখানে আসছি? আপনি কে?

আমার ভাবভঙ্গি দেখে উনি হেসে ফেললেন। বলল, শার্লক হোমস পড় সারাদিন, তাই না?

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম! কে এই রহস্যময় ব্যক্তি? সে কীভাবে জানে এত গোপন কথা? তার মানে অনেক দিন ধরেই সে আমাকে ফলো করছে!

লোকটা হেসে হেসে বলল, সারাদিন তো দাদুর চেম্বারেই বসে থাকো। কে আসল, কে গেল খেয়ালই কর না! আমি তো কত গেছি তোমাদের বাসায়! আমাকে দেখোই নি তুমি? রাতে ক্লাবেই ঘুমায়ে গেছিলা। তোমার মা বলল তোমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতে। কত কষ্ট হইছে তোমাকে কোলে করে এই বাড়িতে আনতে।

ততক্ষণে ওই মহিলাও হাজির। সে এসে মিট মিট করে হাসল। বলল, কীরে ও কি চিনতে পারছে না তোকে?

লোকটা বলল, না, ও তো ভাবছে ওকে কিডন্যাপ করে আনছি। বলেই হা হা হা করে হাসতে লাগল।

দুজনের হাবভাবে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। আমি বললাম, আমি বাসায় যাব।

মহিলা বলল, তা তো যাবেই। নাশতা করে নাও। হাতমুখ ধুয়ে নাও।

আমি বললাম, না ব্রাশ নাই। ব্রাশ না করে নাশতা খাই না।

মহিলা বলল, ছাই দিয়ে মেজে নাও। ওই যে বাইরে ওখানে আছে।

আমি সাথে সাথে বললাম, না।

সুতরাং ওই মুহূর্তেই আমাকে নিয়ে বের হয়ে গেল সেই তথাকথিত মামা। বাড়িটা আসলেই খুব সুন্দর। কিছুটা মাটি দিয়ে তৈরি আর কিছুটা বেড়ার। সামনে আরো একটা সুন্দর টলটলে পুকুর, সেটাতে আবার শাপলা ফুটে আছে।

পথের দুধারে যেদিকে দুচোখ যায় সবুজ ধান ক্ষেত, সবুজ পুকুর কিংবা ঘাস-ভরা গরু-চরা মাঠ। কিছুদূর পরপর বাঁকা ভঙ্গিতে খেজুর গাছ।

কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখি একটামাত্র বাঁশের তৈরি সাঁকো। বেচারা গায়ক আমাকে কাঁধে নিয়ে সে সাকোঁ পার হল। আরো মিনিট বিশেক হাঁটার পর আমার দাদুর বাড়ির রাস্তা চিনতে পারলাম। গেইটের কাছাকাছি যাওয়া মাত্র একছুটে চলে গেলাম বাড়ির ভেতর। আপন মানুষদের দেখতে পেয়ে যেন হালে পানি পেলাম। কিন্তু কোথায় কী! সবাই ব্যস্ত নতুন বউ নিয়ে। এমনকি আমার নিজের রক্তের একমাত্র মাও আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। দুপুর পর্যন্ত যখন কেউ আমার নাশতা খাওয়ার খোঁজও নিল না, বুক ফেটে কান্না পেল আমার। এর চাইতে তো ওই শান্ত স্নিগ্ধ বাসায় ওই গানটা শুনতাম! সেই ভালো ছিল! সেখানে কতই না খাতির ছিল আমার!

গায়ক কচি মামাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাই নাই। উনি নাকি ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলেন গান শিখতে। উনাদের সেই সুন্দর বাসাটাও অনেকবার খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম। খেজুর গাছ পর্যন্ত পথটা চিনি। এরপর আর যাওয়া হয় নাই। তবে মাথায় ঢুকে গেছিল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত। তখন আমরা শুনতাম ‘তু চিজ বারি হ্যা মাস্ত মাস্ত’ আর বাংলায় ‘এটা কি 2441139?’ বলিউড, অঞ্জন দত্ত, মাইলস, জেমস, হাসান এসবের বাইরে নতুন জগত তৈরি করে এই ঘ্যানঘ্যানে সঙ্গীত। এখনো। প্রিয় রাগ ভৈরব, ভূপালি আর মেঘমল্লার। বাসার লোকজন, বন্ধুবান্ধব, প্রেমিকেরা ভীষণ বিরক্ত হয়। এ আবার কী বিষম অত্যাচার!

ওই অপহৃত ভোরটা জীবনে না আসলে হয়ত সঙ্গীতের ধারণাই এরকম হত না।

বনভোজন

হুঁট করে এই কথাটা মনে পড়ে গেল। যদিও এখন আর নাই, তবে তখন শীতকাল মানেই বনভোজন ছিল। অবশ্য বনভোজন কথাটা কখনো কাউকে বলতে শুনি নাই। বলত—পিকনিক, লিখত—বনভোজন। প্রত্যেক ব্যানারেই এই লেখাটা থাকতো—‘চল বন্দু গুরে আসি’ বা ‘চল বন্দু ঘুরে আশি’। সেই সাথে আরো দুই একটা ভুল বানান। কক্সবাজার-কে হয়তো লেখা ‘ককসোবাজার’, চাঁদা বানানে চন্দ্রবিন্দুই নাই, বান্দরবনকে ‘বানরবন’ অথবা আরো হাস্যকর কোনো ভুল। এই তো আমাদের ছোটবেলার দেখা ব্যানার।

logo paromita

পাড়ার গলিতে গলিতে ঝুলানো হত প্রতি শীতে। সবাই পিকনিকে যেত। হয় কাপ্তাই, নয় রাঙামাটি, নয় খাগড়াছড়ি, নয় কক্সবাজার। বন্ধুরা মিলে যেত, আন্টিরা মিলে যেত, আঙ্কেলরা মিলে যেত, নানারা মিলেও যেত। যেতে পারতাম না শুধু আমরা। আমরা মানে যারা কচিকাঁচার দল। যাদের বয়স দশ-এগারোতেই সীমাবদ্ধ।

আমাদের বাসা ছিল দামপাড়া এলাকার সবচেয়ে পুরাতন বিল্ডিংয়ের নিচের তলায়। সামনে বড় উঠান। উঠানের মাঝখানেই বরই গাছ। আর বাম পাশে এক বড় মাঠ। সেই মাঠে একটা মাত্র গাছ ছিল—এক পায়ে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ তিনি তাল গাছ। এবং আমাদের অতি প্রিয় কেননা তিনি যে লম্বা আর একলা! ভূত সংক্রান্ত বানানো সব গল্প তাকে নিয়ে যে বেশ জমতো!

আমার তখন বয়স খুবই কম। নয়-দশ বছর হবে। বড়দের সাথে খেলি মানে যারা ষোল-সতের। ক্রিকেট খেলি, ফুটবল খেলি, কানামাছি, গোল্লাছুট, বিঘ্ঘা, মার্বেল, ডাংগুলি, মালেক-বুলবুলি- সিঙারা এসবও খেলি। বিকালে মাঠে খেলি। আর সন্ধ্যায় উঠানে।
তারপর আস্তে আস্তে সবকিছু ভরাট হতে শুরু করল। সম্পত্তি ভাগ হতে থাকল। একদিন মাঠের মাঝখানে দেয়ালও উঠে গেল। দেয়ালের ওইপাশে টিনের বাড়ি, এইপাশে টিনের বাড়ি উঠতে থাকলো। খেলাধূলা সব উঠানেই। পরিসর সীমিত তাই অত বেশি খেলাও আর যায় না। আর চিৎকারও করা যায় না। বাড়ির লোকজনের ডিস্টার্ব হয়। ওই আধাসমাপ্ত টিনের ঘরগুলাতেও খেলাধূলা হত। খেলা মানে ইনডোর গেইম। উপরে টিনের চাল আর ভিতরে ইটের দেয়াল। চারপাঁচটা এক রুমের ঘর বানানো, দরজা জানালা নাই। সেইখানে ইট সুরকি সিমেন্ট রাখা। ওই লাল ইটের গুঁড়া দিয়ে আমরা নকল রান্না-বান্না খেলতাম।

এমন সময় আরেকটা শীতকাল আসল। আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে বনভোজন লেখা ব্যানার ঝুলতে থাকল। সন্ধ্যায় এসব মোড়গুলিতে ছোকরাবয়সীরা ক্যারাম খেলে। খেলতে খেলতে তাদের আসন্ন পিকনিক নিয়ে আলাপ করে। তখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার করে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। ওই এক ঘণ্টা বাবা মা আমাদের খোঁজ নেয় না। কান ধরে পড়তে বসায় না। আমরা যা খুশি তা করতে পারি। আমরা তখন মিটিং করি। সন্ধ্যার লোডশেডিং মিটিংয়ে আমি প্রশ্ন তুললাম—সবাই পিকনিক করবে, আমরা করবো না কেন? চল আমরা পিকনিক করি!

এ অধিবেশনে কে আমার প্রস্তাবে ভেটো দেবে, আমি তা আগে থেকেই জানতাম। সে দিলও। প্রতিপক্ষের নাম আমার বড় বোন এবং সে আমার কুপ্রস্তাবে যারপরনাই বিরক্ত। আমাদের শক্তি সামর্থ্য নিয়ে সে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলে গেল।

পিকনিক কোথায় হবে? আমরা কি বাস ভাড়া করে যেতে পারবো?

—আমরা কোথাও যাবো না। ওই যে টিনশেড বিল্ডিং উঠতেছে, মাঠের এইপাশে, ওইখানে পিকনিক হবে।

কী হবে? টাকা নাই আমাদের কারো কাছে।

—টাকা লাগবে না। ওইখানে চুলা ধরাব। আমাদের রান্নার হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে রান্না করব।

আর রান্নার জিনিসপত্র? চাল ডাল তরকারি?

—সবাই যার যার বাসা থেকে চুরি করে আনবো।

আমার বড় বোনের খুবই অপছন্দ হইল এই চোরা পিকনিক আইডিয়া। কিন্তু উপস্থিত জনতা তখন চুরি আর পিকনিক দুইটারই মজা পেয়ে গেছে। সুতরাং আগামী শুক্রবার পিকনিক হবেই হবে। আমরা এর নাম দিলাম চোরা পিকনিক। আর পুরা একটা সপ্তাহ এইটার প্ল্যান-প্রোগ্রাম করতে থাকলাম। বড়দের সামনে আলোচনার জন্য এইটার কোড নেইম দেওয়া হইল—পিআইসি-এনআইসি।

আমার বড় বোন, ডানে। - লেখক
আমার বড় বোন, ডানে। – লেখক

সেই শুক্রবার সবচেয়ে বড় বেঈমানি করল আমার বড় বোন। সে তার সবচেয়ে সুন্দর জামাখান পরে পিকনিকে হাজির! এদিকে সবাই যে যার বাসা থেকে দুইটা আলু-একটা পিয়াজ-এক খাবলা চানাচুর ইত্যাদি নিয়া হাজির।

সমস্যা দেখা গেল চুলা জ্বালানোয়। চুলা জ্বালানো যে এত কঠিন কে জানতো! কয়েকটা ইট জড়ো করে, তার মধ্যে আমাদের পুরান বই খাতা কাগজ টাগজ সব দেয়া হইল। কিন্তু ম্যাচটাই আনে নাই কেউ।

পিআইসিএনআইসি-তে যারা অংশ নিছে তাদের মধ্যে বয়স সবচেয়ে কম আমার। আর চুরি বাটপারিতে সবচেয়ে বেশি দক্ষও হইলাম আমি। কটকটি খাওয়ার জন্য বাসার ভালো বাল্ব খুলে নষ্ট বাল্ব লাগায়ে রাখতাম। কটকটিওয়ালার সাথে চুক্তি ছিল। ভালো বাল্ব দিলে ডাবল কটকটি। তার কাছ থেকে নষ্ট বাল্ব ধার নিয়া রাখতাম। আর মা অফিস থেকে ফিরলে বলতাম বাল্ব নষ্ট। মা ভালো বাল্ব লাগাইত, আর আমি ওই নষ্ট বাল্ব দিয়া আবার কটকটি খাইতাম। আরো কত দুই নাম্বারি ব্যবসা ছিল আমার!

আমার বড়বোন ছিল মহাসুন্দরী। পুরা গলির ছেলেরা তার প্রেমে দিওয়ানা মাস্তানা। আর এইসব ভাইব্রাদারের কাছ থেকে কত যে চকলেট চুইংগাম মিমি খাইছি আমি—তার হিসাব নাই। কত চিঠিই না তারা আমারে দিছে আমার বোনরে দেওয়ার জন্য। অনেক গিফটও দিতো। আর সে সবই আমি মেরে দিতাম। চিঠিগুলা নালায় ফেলে দিতাম। আমার বোন কিছু টেরও পাইতো না। কারণ ওইসব গিফট আমি এক ভাইব্রাদারের কাছ থেকে নিতাম আর অন্য ভাইব্রাদারের কাছে কম দামে বেচে দিতাম।

তো আমি নেমে গেলাম চুরিতে। প্রথমে বাসা থেকে ম্যাচ চুরি করে আনলাম। পূজার আসনে প্রদীপ জ্বালানোর যেই ম্যাচ সেইটা আস্তে করে পকেটে ঢুকায়ে নিয়ে আসলাম। এরপর দেখা গেল চালের অভাব। সবাই মুঠোয় ভরে ভরে চাল আনছে। তাই যথেষ্ট চাল হয় নাই। এদিকে বাসায় যে ড্রামে চাল রাখে সেটা রান্নাঘরে। ছুটির দিন হওয়ায় মাও রান্নাঘরে। চাল আনার উপায় নাই।

বুদ্ধি বের করলাম দোকান থেকে চাল নিব। আমি সবসময় দুই পকেট ওয়ালা জিন্সের শার্ট পড়তাম। হাফ প্যান্ট পড়তাম চার পকেটওয়ালা। আর পাড়ার সব মুদি দোকানির সাথেই আমার ফাটাফাটি খাতির ছিল। সবচেয়ে কাছে ছিল প্রদীপ্পার দোকান। দোকানের প্রাচীন মালিক প্রদীপ গত হইছে অনেক আগেই। তবু সবাই ওই দোকানকে বলত প্রদীপ্পার দোকান। আমি হয়তো প্রদীপের নাতির নাতির সমান হব, তবু আমিও বলতাম প্রদীপ্পার দোকান।

তো সেই দোকানে ছিল তার ছেলের ছেলে টিটু। আমি দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়ায়ে থাকলাম। কারণ আমরা মানে বাচ্চারা যা যা কিনি সেগুলি ওর সামনেই সুন্দরভাবে সাজানো। নাবিস্কো চকলেট, ঝাল চকলেট, তাল বিস্কুট, ঝাল আচার, মিষ্টি আচার, বার্মিজ আচার, শন পাঁপড়ি—সবই তার সামনে। আর উপরে চিপস ঝুলানো, পলিথিনে ঝুলানো পাখির ডিম, নারকেলের সন্দেশ, দুই টিক্কা চানাচুর, আরো যা যা আমরা কিনি।

চালও সামনে রাখা। সিদ্ধ আতপ সবই। আর ভেতরের দিকে তাকে তাকে নানারকম জিনিস রাখা। সাবান, গোলাপজল, তেল এইসব। মনে মনে বুদ্ধি করলাম। দোকানদারকে ওই তাক থেকে কিছু নিতে হবে। সে আমার দিকে পিছনে ফিরে নিবে। আর আমি সেই ফাঁকে চাল নিয়ে পকেটে ঢুকায়ে ফেলবো। যেই ভাবা সেই কাজ।

বললাম, আংকেল একটা লাক্স সাবান।

সে লাক্স সাবান নিতে গেল। আমি চট করে আমার প্যান্টের চার পকেটে চাল ভরে ফেললাম। শার্টের পকেটেও। সে সাবান নিয়া আসল। বললাম, আমাদের বাকির খাতায় লেখেন। বলেই আমি দৌড়।

কিন্তু ওইদিকে তো আমার এই চুরি করা চালের পরিমাণ দেখে সবাই হতাশ। এত কমে নাকি কিছুই হবে না।

তো এইবার আমি কয়েকজন কমরেড সাথে নিয়ে গেলাম। যাদের প্যান্টে বড় বড় সাইজের পকেট আছে। এইবার গিয়া বললাম, আংকেল ছোটটা দিছেন কেন, মা বলছে বড়টা দিতে। উনি বড় লাক্স সাবান নিতে গেল আর আমি বললাম, আরেকটা ক্যামেলিয়া, আরেকটা তিব্বত ৫৭০, আর এক ছটাক সোডা…।

সে নিতে নিতে এদিকে আমার বাহিনী চাল, ডাল, দুয়েকটা পেঁয়াজ, রসুন নিয়ে চলেও গেল। দোকানদার টিটু সব জিনিস নিয়ে এসে একটা পলিথিনে ভরে আমাকে দিল। আর বলল, বাকির খাতায়? আমি কী একটা ভেবে বললাম, আরে না, টাকা তো দিছিল মা! আমি আনতে ভুলে গেছি! দাঁড়ান নিয়ে আসি।

বলে আমি চলে আসলাম। কে আর আনতে যায় ওইসব জিনিস!

এদিকে রান্না শেষ হল। লবণ কম, মসলা কম শুধুই চালে-ডালে-আলুতে খিচুড়ি। তবু কী মজা!

সবাই চায়ের চামচের বড়জোড় পাঁচ চামচ খেতে পারলাম। তাও খেলনা প্লেটে নিয়ে! আহাহা তাও কী যে তৃপ্তি এখনো মনে পড়ে! খেতে খেতে সবাইকে বললাম কীভাবে দোকান থেকে চাল চুরি করলাম। আর খাওয়া শেষে সবাই আমারে প্রতিদান দিল—আমি নাকি মহাশয়তান, চালের উপ্রে ডাল, ভাতের উপ্রে বিরিয়ানি, আর্জেন্টিনার উপরে ব্রাজিল, ফোর টোয়েন্টি যোগ ফোর টোয়েন্টি সমান এইট ফোরটি!

বর্ষার বিয়ে

কেন ওই রকম ঘুরানো-প্যাঁচানো আত্মীয়ও না এমন লোকের বিয়েতে গেছিলাম কে জানে! আংকেল যাবে না। আন্টি তারে মুখ ঝামটা দিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা হলেন।

বৃষ্টি শুরু হবার পর থেকেই বর্ষা নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা শুনছি। বাঙালি বোধহয় সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে এ মাসে। আর শৈশব—এইটার একটা বিশেষ অংশ মনে হয় এই মাস।

কারো মাছ ধরার স্মৃতি, কারো জ্বর কিংবা বন্যা কিংবা এরকম কোনো দুর্যোগের কথা। যাই হোক, বর্ষা এসে পড়লেই আমার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা করে বিয়েতে যেতে। উহু! যেমন তেমন বিয়ে না—হিন্দু বিয়ে, গহীন গ্রামের মধ্যে, কনে বাড়ি যাওয়ার পথে হাঁটু সমান কাদা পার হতে হবে আর বহুদূর থেকে কনে বাড়ির ঢাকঢোলের শব্দ শোনা যাবে।

এ রকম একটা ঘটনা আমার জীবনে আছে। কিন্তু এতই ছোটকালের সেই কথা যে বুঝিয়ে লিখতে গেলে কল্পনা মেশানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তখন আমার মা খুব নিষ্ঠুর ছিল বলে মনে হয়। আর সম্ভবত আমি টু কিংবা থ্রি-তে পড়ি। দুষ্টের দুষ্ট-লঙ্কার রাজা বলে স্কুল ছুটি থাকলেই মা আমাকে এদিক-সেদিক পাঠায়ে দিত। এইটুকু মনে পড়ে, কারণ এই সময়ের যেসব স্মৃতি আমার মনে পড়ে বেশিরভাগই আত্মীয় স্বজনদের বাসায় মা-বাবা-বোনদের ছাড়া স্মৃতি।

যাই হোক, যেই আন্টির বাসায় আমাকে পাঠানো হল তিনি আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এবং তার বাসায় বিদ্যুৎ সংযোগ নাই। টয়লেট বাসার বাইরে পুকুর পাড়ে। এবং বাসা থেকে বের হয়ে বাজার পর্যন্ত যেতে আসতে একটামাত্র বাঁশ দিয়ে তৈরি সাঁকো পার হতে হত।

শহরে বড় হওয়া মেয়ের পক্ষে এরকম পরিবেশ সহ্য করা খুবই কঠিন। সাঁকো পারের ভয়ে বাইরে যেতাম না। কারেন্ট নাই সুতরাং টিভি নাই। কোনো বই নাই। কোন সমবয়সী নাই। তবে আংকেল ছিল। উনি বোধহয় কিছু করতেন না। সারাদিন পত্রিকা পড়তেন আর দুপুরে আমাকে নিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। তাও বাড়ির পেছনের পুকুরেই। পুকুরের সামনে বড়শি নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন তিনি। আমিও। কিন্তু কখনোই একটা মাছও ধরতেন না। বড়শি কতবার নড়ে উঠত! আর উনি দেখতাম পুকুরের ওই পাড়ে লতাপাতার দিকে তাকিয়ে আছে তো আছেই।

তারপর ঘণ্টা তিন চারেক পরে জাল ফেলতেন আর নানা রকম মাছ ধরা পড়ত তাতে। আমার আন্টি আবার পুকুরে জাল মারা একদম পছন্দ করতেন না। বড়শি দিয়ে মাছ ধরলে এলিট কাজ, বংশমর্যাদা থাকে। আর জাল দিয়ে নাকি কেবল ‘জাইল্যা’ মানে জেলেরাই মাছ ধরে। জেলে একদম নিচু বংশের লোক। সুতরাং মাছগুলো নেয়ার পর আন্টি প্রতিদিনই ঘ্যান ঘ্যান করে।

বাড়ির সামনে ছিল বিশাল বাগান। সেখান থেকে সবজি তুলে আর পুকুর থেকে মাছ তুলে রান্না আর এরপর খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কোন কাজ ছিল না। তাই বোধহয় হুদাই আন্টি ঝাড়তো আংকেলকে। কথায় কথায় তার বংশ, স্ট্যাটাস এসব নিয়ে নানা কথা বলত। তবে এসবের উত্তরে আংকেলকে কখনো একটা শব্দও বলতে শুনি নি।

পুরো সন্ধ্যা আংকেল একটা পিড়িতে বসে পানদানিতে নিঃশব্দে পান ছেঁচতেন, যাঁতা দিয়ে সুপারি কাটতেন। এখন তো ওই পরিবেশকে স্বর্গ মনে হচ্ছে। কিন্তু তখন সত্যি অসহ্য লাগত। প্রতি সন্ধ্যায় কান্নাকাটি শুরু করতাম—আমার ভালো লাগে না। ভালো লাগে না। আন্টি কী করবে!

একদিন খবর পেল উনার প্রতিবেশীর মাসীর কী এক আত্মীয়ের বিয়ে। বলল, চল যাই বিয়েতে। কী আশ্চর্য! কেন ওই রকম ঘুরানো-প্যাঁচানো আত্মীয়ও না এমন লোকের বিয়েতে গেছিলাম কে জানে! আংকেল যাবে না। আন্টি তারে মুখ ঝামটা দিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা হলেন।

যাই হোক, বিয়েতে গেলাম লঞ্চে। ঘনঘোর বর্ষা তখন। চারিদিকে থই থই পানি। আর অনেক উঁচুতে তীর। মনে আছে আমাদেরকে দড়ি বেঁধে তীরে ওঠানো হইছিল। এরপর দীর্ঘ পথ হাঁটতে হইল। আর পথে সে কি কাদা! দূর থেকে বাজনার শব্দ কানে আসতেছিল। আর সবুজ গ্রামটাকে বৃষ্টিতে ভেজা একটা ছবির মতন লাগতেছিল।

বর্ষায় বিয়ের নৌকা; ছবি. কামাল উদ্দিন

আমি বাইরে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। বরযাত্রীদের দেখা নাই। ক্রমেই সবাই বিরক্ত হতে শুরু করল। মেয়েদের মেকাপ গলে গলে পড়ছে। এদিকে সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে বৃষ্টির তোড়জোড়। এমন সময় কে যেন খবর আনল কাদার জন্য আসতে পারছে না বরযাত্রীরা। খোদ বরের মা কাদায় পিছলা খেয়ে পড়ে গেছে! আর এদিকে সে খবর শুনে সে কী হাসাহাসি! চট্টগ্রামের ভাষায় পা পিছলে পড়াকে বলে—চচ্চড়ি খাওয়া। বিয়ে খাওয়ার আগে চচ্চড়ি কেমনে খেল হবু শাশুড়ি সেইটা নিয়ে অনেক মজার মজার কথাও হল!

কিন্তু আমি কী করি! ওখানে যে আমার কোনো পরিচিতই নাই! সুতরাং একবার দেখতে যাই বাবুর্চিরা কী রাঁধছে, আরেকবার দেখে আসি কনে কী করছে, আরেকবার দেখি কনেপক্ষের লোকজনদের সাজুগুজু। এমন সময় গরুর গাড়িতে করে বর আসতে দেখা গেল। আহা সে যে কী দৃশ্য!

প্রবল বৃষ্টি, সানাই বাজছে আর সেই সাথে কাদা পেরিয়ে হেলতে দুলতে গরুদের তালে তালে দৃশ্যমান হচ্ছে মুখে রুমাল দেয়া, কপালে সাজগোজ আঁকা বর। এদিকে হুড়োহুড়ি—গেইট তো ধরতে হবে। শেষ মুহূর্তে গেইট ধরার ফিতা পাওয়া গেল না। কেউ একজন সালোয়ারের ফিতা নিয়ে আসল। আবার দেখা গেল মেয়ে কম। শালী বেশি হইতে হবে সেইজন্য আমারে টেনে সামনে দাঁড় করানো হইল। আর আমিও একদম সামনে দাঁড়ায়ে গেলাম। যদিও কনেপক্ষ বরপক্ষ কারো সাথেই আমার কোনো পরিচয় নাই।

বর এসে দাঁড়ানো। আমরা গেইট ধরেছি। এদিকে এমন বৃষ্টি। সবার জামাজুতা ভিজে একাকার। তারপরেও টাকা না দিয়ে ঢুকতে পারবে না বর। সবচেয়ে করুণ অবস্থা তারই। পড়ে এসেছে সাদা ফিনফিনে পাজামা পাঞ্জাবি। বৃষ্টিতে ভিজে তার সর্বাঙ্গ দৃশ্যমান। এদিকে দরকষাকষি চলছে সমানে। হঠাৎ বরের দুলাভাই গেল ক্ষেপে। কারণ উনারা এই বৃষ্টির মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝলাম না মুহূর্তেই দুই পক্ষের তর্কাতর্কি—এরপর তুমুল ঝগড়া শুরু হল।

চিৎকার চেঁচামেচি আর ঠেলাঠেলিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু একটু পর কনের মা এসে অনুরোধ করল ওদের আর না ভেজাতে—লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে।

বাইরে বৃষ্টির দাপট বেড়েই চলেছে। আর বিয়ে মণ্ডপে আগুন জ্বলছে। পণ্ডিত মন্ত্র পড়া শুরু করল। আর বর-কনে গড় গড় করে তার সাথে সাথে মন্ত্র পড়া শুরু করে দিল। এদিকে ওই উঠোনের আরেক পাশে খাওয়া-দাওয়া শুরু হয়ে গেছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে বিয়ে দেখছি। ধূপের গন্ধ, আগুনে চন্দনকাঠ আর এদিকে সমান তালে বাজছে ঢাক-ঢোল। মাঝে মাঝে মহিলারা উলুধ্বনি দিয়ে ওঠে। তখন আমার কাছে মনে হয় কী যেন একটা সুখের ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠে যায়।

আন্টি শুরু করল খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি। কী মজা! যে চেয়ারে বসলাম তার নিচেই মাটিতে হাত ধুয়ে ফেললাম। আমার জীবনে ওই রকম ঘটনা ওই প্রথম। নিচে থক থক কাদা আর তার উপরে সাদা কাপড়ের ওপর গরম গরম পোলাও, মুরগী, রেজালা। হুমম! খেতেও মজা। আর মাংসের বড় টুকরা সন্তানদের দেওয়া নিয়ে মায়েদের কাড়াকাড়ি। খাওয়া শেষ তো বিয়ে শেষ!

কনের মুখ ধরে দেখছি আমি (১৯৯৫) – লেখক

আন্টি আর একটুও বসবে না। অথচ যাওয়ার তো উপায়ই নাই। বৃষ্টিতে পানি জমে গেছে। পানি নামলে এরপরই না আমরা যাব! তাই প্রতিবেশীর বাড়িগুলোতে দলে দলে অতিথিদের পাঠানো হল। আমার মনে আছে আমি যে বাড়িতে গিয়েছিলাম তাদের পুজোর ঘরের জানালায় খুব সুন্দর একটা জবাফুলের গাছ ছিল। রক্তলাল ফুলগুলো দেখতে দেখতে আন্টিকে বললাম, মানুষ কেন বর্ষাকালে বিয়ে করে? এত ঝামেলা! তার চেয়ে তো শীতকালে বিয়ে করলেই পারে!

আন্টি বলল, আরে বর্ষায় বিয়ে করলে সেই বিয়ে সুখী হয়। মানুষ তো চায় তার বিয়ের দিন একটু হলেও বৃষ্টি হোক!

আমি অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি?

আন্টি বলল, হুমম, আমার বিয়ের দিনেও তো অনেক বৃষ্টি ছিল!

পারমিতা হিম এর মার্চে প্রকাশিত উপন্যাস নারগিস কিনতে
ছবিতে ক্লিক করুন
দাম ২০৪ পৃষ্ঠা, ৫০০ টাকা
-বহিঃপ্রকাশ

আমি মনে মনে হেসে ফেললাম। এরপর খুব সম্ভবত আন্টির কোলেই আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম। কারণ ওইখান থেকে ফেরার কোনো স্মৃতিই আমার মনে পড়ে না।

মনে পড়ে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার কথা। চোখ খুলে দেখি আংকেল পান পেষার ওই দানিতে তুলসি পাতা ছেঁচছেন। আর সেই মাছ ধরার সময়ের মতই অর্থহীন চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কবেই ভর্তা হয়ে গেছে তুলসী পাতাগুলো! উনি একবার সেইদিকে খেয়ালও করলেন না। আন্টি এসে রামধমক দিলেন, ওইগুলার কি বাপ বাইর করে ছাড়বা? দাও ওরে খেতে।

আমি বললাম, কী হইছে? সাথে সাথে মুখে থার্মোমিটার। জ্বর তখন একশ চার।

টিনের চালে তখনও তুমুল ঝমঝমাঝম শব্দ। কালকে না বিয়েতে গেছিলাম! জ্বরের ঘোরে কিছুটা মনে পড়ে, আবার কিছুটা পড়ে না। বিয়েটা কি স্বপ্ন, না সত্যি ছিল কে জানে!

পারমিতা হিমের আরো লেখা: স্মৃতিকথা, সাম্প্রতিক

টয়লেট খুঁজতে গিয়ে মৃত্যু হলো দুই কিশোরীর—লজ্জিত না, ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত আমাদের!

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থায় শীর্ষ পদে কাজ করছেন বারবারা ফ্রস্ট, উইনি বাইয়ানিমা, করনি উডস, নিক এলিপুই। তাদের এই ভাষ্য দি গার্ডিয়ান ডটকম-এ ১ জুন ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। তা থেকে অনুবাদ করেছেন পারমিতা হিম।

ভারতে দুই কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তারা বাড়ির বাইরে গিয়েছিল টয়লেট খুঁজতে। আর এ সময় তাদের ধর্ষণ করে নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলা হয়। প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারবার জন্য সারা দুনিয়ায় হরহামেশাই মেয়েদেরকে বাইরে এরকম অরক্ষিত জায়গায় যেতে হয়।

টয়লেট-বাথরুম বা ফ্রেশরুম—আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন—ঘরে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, শপিং মলে আমরা অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে দারুণ অস্বস্তি বোধ করি। কিন্তু আমাদেরকে যে কথা বলতেই হবে—
কারণ টয়লেটের অভাবে মেয়েদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।

কাটরা গ্রামে দুই মেয়ে খুন হওয়ার পর রাজনীতিবিদদের আগমন বেড়ে গেছে; হেলিকপ্টারে করে এসেছেন মায়াবতী। পিছনে ধুলায় আম গাছ অস্পষ্ট, যেখানে মেয়ে দুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার পর ঝোলানো হয়েছিল। গ্রামের স্কুলের দারোয়ান মহেশ কাশ্যপের বর্ণনায়, বাতাসে মেয়ে দুটি এমন ভাবে দুলছিল যেন তারা পুতুল। ছবি. Jesse Pesta/The Wall Street Journal।)

পৃথিবীতে বর্তমানে আড়াই বিলিয়ন লোক পর্যাপ্ত টয়লেট সু্বিধা ছাড়াই বাস করছে। এর ফলে মেয়েরা বাধ্য হচ্ছে অন্ধকার, বিপদজনক এলাকায় তাদের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা খুঁজে নিতে। আর এ ধরনের জায়গায় পুরুষেরা অপেক্ষা করে মেয়েদেরকে আক্রমণ করার জন্য।

তাই লজ্জায় লাল হওয়া বন্ধ করে আমাদের উচিত এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা। এটা লজ্জার বিষয় না, বরং ক্রুদ্ধ হওয়ার মত বিষয়।

ভারতের মেয়ে দুইটি সম্পর্কে আত্মীয়, একজনের বয়স চোদ্দো, অন্যজনের ষোলো। দেশটির উত্তরপ্রদেশের গ্রাম কাটরায় তাদের বাড়ি। তারা বাড়ির বাইরে গিয়েছিল কারণ তাদের বাসায় পায়খানা ছিল না। তারা আর কখনো বাসায় ফেরে নি। নৃশংস হামলার পর তাদের মৃতদেহ গাছে ঝোলানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

মাটির দেওয়ালে ছোট মেয়েটির আঁকা ফুল ও পাখি। ছবি. Jesse Pesta/The Wall Street Journal

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাইমস অব ইনডিয়া—
তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির উত্তর প্রদেশ এলাকার পঁচানব্বই ভাগ ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখন যখন মেয়েরা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে বাড়ির বাইরে অন্ধকার বা নির্জন জায়গায় যায়।

তবে এ সমস্যা অবশ্যই শুধু ইনডিয়ার সমস্যা না। পৃথিবীর প্রতি তিনজন লোকের মধ্যে একজন স্যানিটেশন সু্বিধা বঞ্চিত। এর মধ্যে এক বিলিয়ন, মানে গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যার পনের শতাংশ লোক খোলা জায়গায় পায়খানা করে।

নাইজেরিয়ার লাগোস—
এ ওয়াটার এইডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে স্যানিটেশেনর পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে এমন নারীর এক তৃতীয়াংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হয়রানি, হুমকি কিংবা সহিংসতার শিকার হয়। আর এ ঘটনাগুলি নিরাপদ, গোপন টয়লেটের অভাবেই হয়। কেনিয়া এবং সলোমন দ্বীপের উপর গবেষণায়ও একই রকম ব্যাপার দেখা গেছে্।

নদীর ধারে, মাঠে কিংবা পথের পাশে মলমূত্র ত্যাগ করা শুধু যে মেয়ে আর মহিলাদের যৌন হয়রানি বা সহিংসতার কারণ তা নয়, এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিরও বিষয়।

এর ফলে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলি দূষিত হচ্ছে, রোগ-বালাই বিশেষ করে ডায়রিয়া ছড়াচ্ছে। আর এ ডায়রিয়াই উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। পৃথিবীতে প্রতিদিন ১৪০০ মা তার একটি সন্তানকে হারান এ রোগের কারণে, যার উৎস স্যানিটেশনের অভাব, বিশুদ্ধ পানি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ বন্ধ করতে পারলে এ মৃত্যু্হার অর্ধেকেরও বেশি কমে আসবে।

এ সমস্যার সমাধান করা যায়। আর সমাধানের প্রথম ধাপ হল আমাদের অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠা। জাতিসংঘের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল, জ্যান এলিয়াসন, গত সপ্তাহে খোলা পায়খানার ব্যাপারে রহস্যময় নীরবতা ভঙ্গ করার আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্য এবং ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন একদম সঠিক সময়েই হয়েছে। এখন মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল-এর আওতাভুক্ত দেশের সরকারগুলি দারিদ্র্য দূরীকরণের নতুন কৌশল গ্রহণ করবে।

জাতিসংঘের ‘আমার বিশ্ব’ নামে জরিপে, যেখানে বিশ্বের কয়েক হাজার কোটি লোক অংশ নিয়েছে, বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশনের সুযোগ পঞ্চম দাবি হিসেবে উঠে এসেছে। ভারতের ভোটাররা ভালো জীবনযাপনের জন্য এটিকে চতুর্থ দাবি হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

ভারতের একটি বস্তি। সাধারণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে শিশুরা প্রায়ই রেললাইনের ধারে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। ছবি : জন স্পাউল/ ওয়াটারএইড

ওয়াটার এইড, ইউনিসেফ, দি ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গাইনাজেশনসহ বিশ্বের আরো কয়েকশ সংগঠন নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করছে যেটির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশগুলি সবার জন্য স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

সারা বিশ্বের এই স্যানিটেশন উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ ভারতের ওই দুই মেয়ের ক্ষেত্রে বড্ড দেরিতে হয়েছে। কিন্তু তাদের এই ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কেন এই পানি এবং স্যানিটেশনের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার! আর কীভাবে এই অধিকারের অভাবে প্রতিদিন হাজার কোটি শিশু, মেয়ে ও নারীকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।